তিনি শিল্প সৃষ্টিকে মানসিক সংঘর্ষের মঞ্চ হিসেবে দেখান এবং সমসাময়িক চিত্রকলা ও কার্টুনিশ শৈলীতে শারীরিক-মানসিক জটিলতাগুলো সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করে শিল্পী জীবনের সত্য উন্মোচন করেন।
প্রশ্ন: মুসলিমোভা, বহু বছর ধরে আপনার শিল্পচর্চা একটি চরিত্র “ফাতেবি”-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আপনি কি তাকে আপনার বিকল্প সত্তা (alter ego) বলে মনে করেন?
: না, আমি তাকে বিকল্প সত্তা বলব না। হয়তো বলা যায়, তিনি একটি আত্মপ্রতিকৃতি, কিন্তু এমন এক আত্মপ্রতিকৃতি, যা আমি নিজে না। একটা অঙ্কন, সমতল এবং ছায়াবিহীন রেখাচিত্র, আর আমি খুব সতর্কভাবে তাকে ওই সমতল রেখাতেই রাখি। সেটি আমার এক ধরনের সারোগেট সেল্ফ বা নিজের জন্য তৈরি একটি যন্ত্রের মতো। এটা এমন সব আবেগ বা মানসিক অভিজ্ঞতাকে চ্যাপ্টা করে প্রকাশ করতে সাহায্য করে, যেগুলো আমার ভেতরে থাকে বলে ধরার মতো রূপ নেই। এক ধরনের সরল কৌতুক বলা যায়, যা এসব অস্পষ্ট অনুভূতিকে স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য করে তোলে।
প্রশ্ন: আপনার মতে, সব ভালো শিল্প কি শিল্পীর জন্য এমন কিছুই করে?
: আমি বলতে পারি না! আমি শুধু আমার নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েই বলতে পারি। তবে মাঝে মাঝে আমি যখন ফাতেবি সম্পর্কে বলি, তখন টের পাই আমি যেন আসলে শিল্প তৈরির ব্যাপারটাই বর্ণনা করছি। হয়তো এ কারণেই আমি তার সঙ্গে এত জড়িয়ে আছি, কারণ তিনি যেন আমার সৃষ্টির এক চূড়ান্ত প্রেরণা। আমি তাকে এমন একটি সত্তায় পরিণত করেছি যার নিজের ব্যক্তিত্ব আছে, নিজস্ব জগতে নিজের মতো করে টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। তিনি আমাকে মাঝেমধ্যেই চমকে দেন! আর সব আঁকাজোকা আবার বারবার সেখানেই ফিরে যায়।
প্রশ্ন: গ্রাফিতি শিল্পী আন্দ্রে সারাইভা বলেছেন, তিনি তার চরিত্র Mr. A-কে লক্ষ লক্ষবার এঁকেছেন, যেন একটা বাধ্যতামূলক কাজ। আপনার ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছু?
: আমার ক্ষেত্রে এটা বাধ্যতামূলক নয়। এটা কোনো দৈনন্দিন অনুশীলন নয়, যদিও মাঝে মাঝে সেটা এমন হয়। আমি তার প্রতি আসক্ত নই। আঁকা না লাগলে আমি বরং অন্য কিছু করতেই বেশি পছন্দ করি! আমি চাই একটা ভালো আঁকা হোক, তাই অনেক হাঁটাহাঁটি করি, শরীরেও, মাথার ভেতরেও। তারপর আঁকতে ভয় লাগে।
প্রশ্ন: কেন ভয় পান?
: কারণ যদি আমার মনের কথা ঠিকঠাক না হয়? কিছু আঁকার আগে অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়। যেমন আমার সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে, ডেভিড জ্ভিরনার গ্যালারিতে, আমি উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত কাজ করেছি। কারণ এই চরিত্রটা এমন এক মাধ্যম, যার মাধ্যমে আমি আমার নিজের ভেতরের ও বাইরের ঘটনাগুলোর প্রতিফলন দেখি। এটা সময়োপযোগী। মহামারির সময় আমি অনেক ভাবতাম কীভাবে শরীর বা মনকে ঘিরে থাকা জায়গাগুলো সংকুচিত বা বিস্তৃত হয়। তখন আমাদের চারপাশের দেয়াল, যেগুলোর মধ্যে আমরা সময় কাটাতে বাধ্য হই, এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।
প্রশ্ন: ফাতেবিকে আমরা দেখেছি সিঁড়ির চারপাশে প্যাঁচানো, একটা বোতলের মধ্যে আটকে, জানালায় চেপে বসা, এমনকি শরীর থেকে তরল বের হচ্ছে এমন দৃশ্যেও। এসব ভঙ্গি কি আপনার আবেগী অবস্থার প্রতিফলন?
: আমি আঁকা শুরু করেছিলাম স্কুলজীবনের একটা পর্যায়ে খুব হতাশাজনক সময়ের পর। পরে বুঝেছি, আমি কিছু একটা বলার জন্য ভীষণ মরিয়া ছিলাম। আর হাস্যরস ছিল সেটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রকাশের উপায়। কোনো ভাবনা কাজ করে না, যদি সেটা আমাকে হাসাতে না পারে। এমনকি সেটা যদি ভয়ংকর বা গা ছমছমে কিছু হয়, তবু তাতে এক ধরনের অন্ধকার রস থাকতে হয়, যাতে বোঝা যায়, সেটা কিছু বলছে, আবেগে ভেসে যাচ্ছে না। যেমন “লিকিং ভেসেলস” নামের ছবিটার কথাই ধরুন, তখন হয়তো আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। তবে আমি প্রায়ই এমনটা অনুভব করি। আমি আমার অনুভূতি তুলে ধরতে চাই না, বরং অনুভূতিগুলোকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি রূপ ও গঠন ভাবতে, যা ভিজ্যুয়াল আর্টের মূল উপাদান।
প্রশ্ন: যাই হোক, শুনে মনে হচ্ছে এটা বেশ আবেগঘন একটা শ্রম।
: শিল্প তৈরি করাটা খুব সুখের কিছু না, আমার জন্য তো নয়। অনেক সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রেই এটা হয়তো সত্যি… কিন্তু আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করি, তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেলি, আমি তার সমস্যাগুলো তৈরি করি, যেগুলোর জন্য তাকে নিজেই সমাধান হতে হয়। অথচ সেই সমাধানের সূত্রটাও সে-ই ধরে রাখে। যতক্ষণ না তিনি এমনভাবে প্রকাশিত হন, যা আমার কাছে অর্থবহ, আমি যেন এক ধরনের বন্দিত্বে থাকি। আমাদের সম্পর্ক এমনই, একটা বাঁধন। নিজের সত্তার সঙ্গে এই সম্পর্ক অনেক সময় এক ধরনের কারাগার। আবার সেটা উপভোগও করি।
প্রশ্ন: তাহলে কি কখনো বিরতি নিতে হয় আপনাকে?
: হ্যাঁ, ক্লান্ত হই। তখন আমি সেটি নিয়েও একটা ড্রয়িং করি! এটাই সেই বাঁধন। বহুবার মনে হয়েছে, “আর কত?” ভাবি, “ এবার ওকে মেরে ফেলি।” কিন্তু তারপর ভাবি, তাহলে তো এটা নিয়েই একটা ছবি আঁকতে পারি, ওকে মারার ছবি! তখন সেটা আঁকি, আর তাতে যেন মনে হয় পরের ছবির জন্য জায়গা তৈরি হয়ে গেল। সুতরাং আমি বিরতি নিই, নিজেকে বিরতি নিতে বলি, কিন্তু আবার ফিরে আসি।
প্রশ্ন: বারবার একই চরিত্র আঁকাটা কি একধরনের পরিচিত আরাম দেয়?
: একদমই। আমি তাকে চিনি। এই পরিচিতি একটা স্বস্তি দেয়, ভবিষ্যতে কী হবে তা না জানার ভয় কিছুটা কমে। আমি জানি, সে নিজের মতো করে পড়ে থাকতে পারবে। একটা চরিত্রকে একফ্রেমে আঁকার কিছু সীমাবদ্ধতা তো আছেই। শুরুতে আমি কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছিলাম. যেমন কোনো ছায়া নয়, কারণ ছায়া বললে গভীরতা আসে, যেটা আমি চাইনি। তিনি কেবল কালো রেখা, যেন আলোকিত হয়ে ঝলসে যাওয়া, এই সীমার মধ্যে রেখেই আমি তাকে গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, এসব নিয়ম তো আমরা নিজেরাই বানিয়েছি। আর আমার পক্ষে এখন এসব ভেঙে ফেলা সম্ভব, কারণ এখন তিনি এতটাই পরিণত, যে তার চারপাশে কিছু নতুন যোগ করলেও তিনি ঠিকঠাক থাকবেন। তিনি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী।
প্রশ্ন: আপনি এখন রঙও ব্যবহার করছেন, এটাও কি সেই পরিসর বাড়ানোর অংশ?
: অনেক বছর আমি তাকে শুধু সাদা-কালোয় এঁকেছি। একটা সময় দেখলাম, যারা রঙ ব্যবহার করছে, তাদের প্রতি আমার হিংসে জন্মাচ্ছে! তখন বুঝলাম, সাদা-কালোর নিয়মটাও আমি নিজেই বানিয়েছি, কোনো বাস্তব কারণ ছিল না। তারপর রঙ ব্যবহার করতে শুরু করলাম, কিন্তু ভাবলাম রঙ কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করব? কারণ তিনি তো সবসময় একা থাকেন, তাই রঙ যেন তার পাশে আরেকটা চরিত্রের মতো এক ধরনের ক্যামিও। কিছু ছবিতে রজার র্যাবিট-এর মতো একটা ভাব হয়, যেখানে সে রঙিন জগতের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, রঙের সঙ্গেও কথা বলতে পারে যেন।
প্রশ্ন: সময় নিয়ে ধীরে ধীরে নতুন জিনিস যোগ করাটা কি আপনার পছন্দের পদ্ধতি? আপনি কি কখনো নতুন কোনো চরিত্র যোগ করার কথা ভাবেন?
: এই ধীর গতিটাই আমার খুব পছন্দ, এটা খুব স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায়। আমার জন্য এটা দরকার। আমি মনে করি অন্য চরিত্রটা হচ্ছে সেই স্থানবিশেষ স্থাপত্য বা ঘর, যেখানে কাজগুলো রাখা হয়, আর দর্শকের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। “ফাতেবি ডাইজেস্ট”-এর জন্য আমি একটাই আকারে ছবি এঁকেছি, একইরকমভাবে ফ্রেম করেছি, তাই সেগুলো যেকোনো জায়গায় রাখা যায়। কিন্তু প্রদর্শনীর দ্বিতীয় কক্ষে, দুটি বড় ছবি ও একটি মিউরাল ছিল। মিউরালটা পুরো দেয়ালে আঁকা হওয়ায় সেটি নির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক ছিল। আমি মনে করি, সেই স্থানটিই আরেকটা চরিত্রে পরিণত হয় যার সঙ্গে ফাতেবির সম্পর্ক তৈরি হয়। আর আমি সেই দিকটা নিয়েই ভবিষ্যতে কাজ করতে আগ্রহী।
Emma Robertson,
Executive Editor, The Talks


