ইসলামের ইতিহাসে শিয়া-সুন্নি বিভাজন একটি গভীর ও সংবেদনশীল অধ্যায়, যার শেকড় প্রোথিত আছে মহানবী (সা)-এর উত্তরাধিকারের প্রশ্নে। এই বিভাজনের সূচনা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইসলামের ইতিহাসের একেবারে ঊষালগ্নে, বিশেষ করে “গাদীর খুম” (غدير خم) নামক একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে।
“শিয়া” শব্দটি এসেছে “শিয়াতু আলী” বা “আলী’র দল” থেকে। তারা বিশ্বাস করেন, নবী (সা)-এর পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব বা খেলাফতের একমাত্র ন্যায্য অধিকারী হলেন তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাতা হযরত আলী (রা)। অন্যদিকে, “সুন্নি” বা “আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আহ” এর অনুসারীরা মনে করেন, নবী (সা) নির্দিষ্ট কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেননি, বরং মুসলিমদের পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র মাধ্যমেই নেতা নির্বাচিত হবেন।
গাদীর খুম: যেখান থেকে বিতর্কের শুরু
১০ম হিজরিতে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর জীবনের শেষ হজ, যা ‘বিদায় হজ’ নামে পরিচিত, তা থেকে মদিনায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ‘গাদীর খুম’ নামক স্থানে তিনি প্রায় লক্ষাধিক সাহাবীর কাফেলাকে থামিয়ে একটি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি হযরত আলী (রা)-এর হাত উঁচু করে ধরে জনতার উদ্দেশে ঘোষণা করেন:
“মান কুনতু মাওলাহু, ফা-হাযা আলিইয়্যুন মাওলাহু” (আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা)।
এই একটি বাক্যই শিয়া-সুন্নি ব্যাখ্যার ভিন্নতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
দুই ব্যাখ্যা: নেতৃত্বের ঘোষণা নাকি বন্ধুত্বের প্রকাশ?
শিয়া মুসলমানদের কাছে গাদীর খুমের ঘটনা হলো হযরত আলী (রা)-এর খেলাফতের সুস্পষ্ট ও ঐশী ঘোষণা। তাঁদের মতে, এখানে “মাওলা” শব্দের অর্থ “নেতা” বা “কর্তৃত্বের অধিকারী”। শিয়ারা বিশ্বাস করেন, এই ঘোষণার পরই কুরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতটি নাজিল হয়, যেখানে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিনটিকে স্মরণ করে তাঁরা প্রতি বছর ‘ঈদে গাদীর’ পালন করেন।
অপরদিকে, সুন্নি আলেম ও ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, “মাওলা” শব্দের অর্থ এখানে “বন্ধু” বা “প্রিয়জন”। তাঁদের মতে, এই ঘোষণার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল। ইয়েমেন থেকে ফেরার পথে গনিমতের মাল বণ্টন নিয়ে হযরত আলী (রা)-এর সাথে কিছু সেনার মতবিরোধ তৈরি হয়। নবী (সা) সেই বিতর্ক নিরসন এবং আলী (রা)-এর প্রতি নিজের ভালোবাসা ও সমর্থন প্রকাশ করার জন্যই এই কথা বলেছিলেন। সুন্নিরা যুক্তি দেন, খেলাফতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নবী (সা) এমন পরোক্ষ শব্দে ঘোষণা না করে আরও পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারতেন।
সাকিফা বনু সায়িদা: ক্ষমতার পালাবদল
নবী (সা)-এর ওফাতের পরপরই এই মতপার্থক্য বাস্তবে রূপ নেয়। যখন হযরত আলী (রা) ও নবী পরিবার নবীজীর দাফন-কাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন মদিনার ‘সাকিফা বনু সায়িদা’ নামক স্থানে আনসার ও মুহাজিরদের একাংশ হযরত আবু বকর (রা)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচন করেন।
শিয়াদের মতে, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যেখানে নবী (সা)-এর পরিবারের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সুন্নিদের মতে, সাকিফার সিদ্ধান্ত ছিল উম্মাহকে নেতৃত্বহীন অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সাহাবীদের ‘শূরা’ বা পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
ইমামত বনাম খেলাফত: মূল মতাদর্শিক পার্থক্য
এই বিভাজনের মূলে রয়েছে নেতৃত্ব বিষয়ক দুটি ভিন্ন ধারণা—শিয়াদের ‘ইমামত’ এবং সুন্নিদের ‘খেলাফত’।
শিয়া ইমামত: শিয়ারা বিশ্বাস করে, ইমামত আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একটি আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পদ। নবী (সা)-এর পর এই পদের অধিকারী তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, যাঁরা নিষ্পাপ (মাসুম) এবং ইসলামের নির্ভুল ব্যাখ্যাকারী।
সুন্নি খেলাফত: সুন্নিরা মনে করে, খেলাফত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিমরা পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিকে শাসক হিসেবে নির্বাচন করবে। তাই তাঁরা প্রথম চার খলিফাকে ‘খুলাফায়ে রাশিদুন’ বা ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে শ্রদ্ধা করেন।
কারবালার ট্র্যাজেডি: বিভক্তি যখন রক্তে রঞ্জিত
প্রাথমিকভাবে এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক থাকলেও ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা এটিকে একটি গভীর আবেগ ও ধর্মীয় পরিচয়ে রূপান্তরিত করে। নবী (সা)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা) তৎকালীন উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং মুষ্টিমেয় সঙ্গীসহ শহীদ হন। এই শাহাদাত শিয়া ইসলামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে।
সময়ের সাথে সাথে এই বিভাজন মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ষোড়শ শতকে ইরানে সাফাভি রাজবংশ শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে এই বিভাজন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক রূপ লাভ করে। আজকের দিনেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে এই ঐতিহাসিক বিভাজনের ছায়া দেখা যায়, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে ক্ষমতার লড়াই মূল কারণ হিসেবে কাজ করে।
শিয়া-সুন্নিদের বাহ্যিক পার্থক্য
নেতৃত্বের ধারণা ছাড়াও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ফিকহ (ইসলামি আইন) ও ধর্মীয় আচারে কিছু পার্থক্য রয়েছে, যেমন: সাহাবীদের মর্যাদা বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, নামাজ ও আজানের পদ্ধতিতে সামান্য ভিন্নতা এবং আশুরা পালনের রীতি। শিয়ারা ইমাম হুসাইন (রা)-এর শাহাদাতের স্মরণে মহররম মাসে গভীর শোক পালন করে, যা তাদের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিভেদ নয়, সম্প্রীতির অন্বেষণ
শিয়া-সুন্নি বিভাজনের ইতিহাস জটিল এবং বেদনাদায়ক। কিন্তু এই বিভেদের মাঝেও উভয় সম্প্রদায়ের মৌলিক বিশ্বাস এক: এক আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা)-এর নবুওয়ত, পবিত্র কুরআন এবং পরকাল। পার্থক্যগুলো মূলত ইতিহাস, ব্যাখ্যা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে।ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির মনোভাব পোষণ করাই এখন সময়ের দাবি। গাদীর খুমের ঘটনা যেমন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটি হযরত আলী (রা)-এর প্রতি নবী (সা)-এর গভীর ভালোবাসারও প্রমাণ। এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার শিক্ষাকে ধারণ করেই মুসলিম উম্মাহ শান্তি ও ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে।


