বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার মধ্যে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া অন্যতম বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নওশিন জাহান (ছদ্মনাম) এবং তার মতো অনেক শিক্ষার্থী পড়েছেন দীর্ঘ ছুটির শিকারে। বছরের শুরুতে শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী বই পেতে না পারা এবং অতিরিক্ত ছুটির কারণে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নওশিনের মা বলেন, “আমার স্বামী একজন কম্পিউটার অপারেটর। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করতে হলে গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে হবে। কিন্তু তার জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন তা আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে জোগানো সম্ভব না।” ফলে ছুটির কারণে তার মেয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়বে, যা তার পরিবারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এধরণের ঘটনা শুধু নওশিনের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের সাধারণ শিক্ষাক্রমের আওতাধীন প্রায় সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই ঘটছে।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ২৬১ কর্মদিবসের মধ্যে প্রায় ১১০ দিন ছিল ছুটি। এটি প্রায় অর্ধেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা, যাদের কাছে গৃহশিক্ষক কিংবা কোচিং করানোর সুযোগ নেই। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় এবং কিন্ডারগার্টেনগুলোতে পাঠদান অব্যাহত থাকায় বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা কিছুটা এগিয়ে থাকছে। করোনার পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ঘরবন্দি ছিল এবং তখন থেকেই শিখন ঘাটতির প্রভাব পড়তে শুরু করে। শিক্ষা সংক্রান্ত বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে ৯৮ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষক এবং ৯৬ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষক জানাচ্ছেন, করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা কোচিং এবং গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে কিছুটা ঘাটতি পূরণ করছে, তেমনি নিচু-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা শিখন সংকটে পড়ছে। বিশেষত যারা গ্রামাঞ্চলে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও প্রকট। এই প্রেক্ষাপটে সমাজের সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ বিত্তবানরা উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের সন্তানদের শিখন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারি স্কুলগুলোর ছুটি কমানো উচিত এবং শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য কোচিং কিংবা অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেইসাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের শিক্ষাদানে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। বেসরকারি স্কুলগুলোর মতো সরকারি স্কুলগুলোরও শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা ভবিষ্যতে কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার না হয়। নতুন শিক্ষাপঞ্জি তৈরি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের সময়সীমা পুনঃনির্ধারণের দাবি উঠেছে যাতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি মোকাবিলা করা যায়। এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে সরকারকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।


