১লা মে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এর শিকড় ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে, যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ১লা মে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ৩ মে হে মার্কেট স্কয়ারে রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক নিহত হন এবং পরে আটজন শ্রমিক নেতাকে সাজা দেওয়া হয়, যাদের ‘শিকাগো মার্টায়ার্স’ বলা হয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেস এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সে থেকে শুরু হয় এক বৈশ্বিক ঐক্য, যেখানে শ্রমিকের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ন্যায্য মজুরি এবং মর্যাদার দাবিতে লক্ষ-কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
তখনকার ব্রিটিশবিরোধী শ্রমিক আন্দোলনের ধারায় বাংলাদেশে মে ডে পালিত হয় ১৯২১ সাল থেকে। এখনো এই দিনটি শ্রমিকশ্রেণির জীবনমান উন্নয়ন, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ন্যায়সংগত মজুরি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক। কার্ল মার্কসের ‘শ্রম-মূল্য তত্ত্ব’ (Value of Labour Theory) অনুযায়ী, শ্রমই পণ্যের আসল মূল্য সৃষ্টি করে, অথচ শ্রমিক তার উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত থাকে। এই তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দুই ভাগে বিভক্ত আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৩ অনুসারে দেশের শ্রমশক্তির ৮৫% অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) তথ্যানুসারে, এই খাতে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে ৮০% নারী। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে এই খাতের শ্রমিকদের মাসিক গড় আয় ১৩,০০০ টাকা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পোশাকের মুনাফা তার তুলনায় বহু গুণ বেশি। কৃষি খাতে প্রায় ৪৮% মানুষ যুক্ত। অধিকাংশ ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক মৌসুমভিত্তিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে প্রায় ৩০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক দেশের নগরায়ন প্রক্রিয়ার প্রধান শক্তি হলেও শ্রমিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিক থেকে অবহেলিত।
গবেষণায় দেখা যায়, পোশাকশিল্প ও গৃহকর্মী খাতে নারীশ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্যমতে, ৭৬% গৃহকর্মী কখনও চুক্তিপত্র পায় না এবং ৬৩% যৌন হয়রানির শিকার হয়। নারীশ্রমিকদের অবদান অর্থনীতিতে অপরিসীম হলেও সামাজিক স্বীকৃতি তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত শ্রমিকদের অধিকাংশেরই কর্মচুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ইত্যাদি নেই। বিশেষজ্ঞরা একে ‘অদৃশ্য শ্রম’ (Invisible Labour) বলে অভিহিত করেন। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, ফলে লিঙ্গ ও শ্রেণি দুই ধরনের বৈষম্য একইসাথে কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় শ্রমিক শ্রেণি এখনও নীচুস্তরে অবস্থান করছে। পুঁজিপতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি উভয়ই শ্রমিকদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও, সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা বঞ্চিত। ‘শ্রমিক’ পরিচয় এখনও ‘অশিক্ষিত’, ‘নিম্নবিত্ত’ ও ‘অযোগ্য’ এই ধারণার সাথে জড়িত। অথচ শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মে ডে বাংলাদেশের জন্য কেবল শ্রমিক অধিকারের স্মারক নয়, এটি আমাদের সমাজের অবচেতনে চাপা পড়া শ্রমিক শ্রেণির মর্যাদার পুনর্জাগরণের আহ্বান। রাষ্ট্র, পুঁজিপতি এবং নাগরিক সমাজ—এ ত্রিমাত্রিক শক্তির নৈতিক দায়িত্ব হলো শ্রমিককে কেবল শ্রমের যন্ত্র নয়, পূর্ণ মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। কারণ শ্রমিকের হাতে গড়া প্রতিটি পথ, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি বস্ত্র আমাদের সভ্যতার ভিত্তি। এই ভিত্তি উপেক্ষিত থাকলে কোনও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না।


