“কে বলেছিল, পঞ্চায়েতে বিচার হয়? যে বেশি গলা ফাটায়, লাঠি চালায়, বিচার তারই পক্ষে যায়।” —এই কথাটা বলেছিলেন উপন্যাসের এক বৃদ্ধ চাষা, যখন তাঁর গরু চুরি যাওয়ার বিচার করতে গিয়ে তিনি শুনলেন চোর নাকি সে নিজেই!
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস “গণদেবতা” ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়। একটি গ্রামীণ সমাজের বুক চিড়ে সত্য উন্মোচনের চেষ্টা। বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের অন্তস্তল থেকে উঠে আসা এই উপন্যাস কেবল সাহিত্য নয়, বরং সমাজ-রাজনীতির একটি বিশ্লেষণাত্মক দলিল। এটি এমন এক সময়ের কাহিনি, যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, কৃষকের দুর্দশা, ধর্মীয় বিভাজন, সমাজতান্ত্রিক চেতনা, কুসংস্কার, এবং গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি গ্রাম, যার নাম কাহিনি চলতে চলতে পাঠকের কাছে ধরা দেয় এটি যেন বাংলারই যেকোনো একটি প্রান্তিক অঞ্চল। এখানে মানুষ কৃষিকাজ করে, জমিদারদের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে, ধর্ম নিয়ে বিভাজিত এবং পরস্পরের প্রতি এক অদ্ভুত অবিশ্বাসে বাস করে।
গল্পটি কোনও নির্দিষ্ট চরিত্রকেন্দ্রিক নয়। বরং এটি বহু চরিত্রের সম্মিলনে গড়ে ওঠা একটি গ্রামীণ মহাকাব্য। এখানে রয়েছে দরিদ্র কৃষক, যাঁদের জীবিকা গো-চাষ, খেতমজুরি ও ভাগচাষের উপর নির্ভরশীল; রয়েছে গ্রামের মৌলবী, পুরোহিত, মাঝারি জমিদার; রয়েছে নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ, যারা শহর থেকে ফিরে সমাজ পাল্টানোর স্বপ্ন দেখে।
উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি, গ্রামের এক কৃষকের গাভী চুরি হয়ে গেছে, আর সে বিচার পায় না। এরপর আসে জমি নিয়ে সংঘর্ষ, ঋণের দায়ে বাড়িঘর বিক্রি, দুর্ভিক্ষে মৃত্যু, চরম কুসংস্কারে গ্রাম জর্জরিত হয়ে পড়া। একসময় গ্রামে আসে রাজনৈতিক প্রভাব, যেমন কংগ্রেস ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার কিছু তরুণ। তারা বলে এই অবিচার ঠেকাতে হবে, একসাথে প্রতিরোধ গড়তে হবে। কিন্তু এই প্রতিরোধও শেষমেশ নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
উপন্যাসটি যখন লেখা হয় (প্রথম প্রকাশ: ১৯৪২), তখন ভারতবর্ষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং গ্রামীণ সমাজে চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। জমিদারী ব্যবস্থা তখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, ফলে কৃষকের জীবন দুর্বিষহ ছিল।সামাজিক বিভাজন হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব, জাত-পাত, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব কিছু মিলে এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছিল।তারাশঙ্কর এই সবকিছুকে অবলম্বন করে এক দুর্দান্ত বাস্তবতা নির্মাণ করেন। তিনি কোনো পক্ষ নেন না, বরং বাস্তবতাকে চিত্রিত করেন। তিনি দেখান, কিভাবে ক্ষমতার ভেতরে বাস করে শোষণ, কিভাবে ধর্মের আড়ালে ঢেকে রাখা হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য, আর কিভাবে সাধারণ মানুষ যাঁদের ‘গণ’ বলা হয় তাঁরাই অবজ্ঞার পাত্র।
‘গণদেবতা’তে একক কোনো নায়ক নেই। বরং প্রতিটি চরিত্রই একটি শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন—মোল্লা সাহেব ধর্মের মুখপাত্র হলেও সমাজে বিভাজন তৈরি করেন। ব্রাহ্মণ ঠাকুর অন্ধ গোঁড়ামিতে বিশ্বাস করেন, অথচ নিজের স্বার্থে ধর্মব্যবসা করতে পিছপা হন না। শহরফেরত তরুণ সমাজতান্ত্রিক, কিন্তু বাস্তবতার মুখে তারা হতাশ। এই চরিত্রগুলো নিয়ে লেখক যে চিত্র রচনা করেছেন, তা কখনো নাটকীয় নয়, বরং নীরব ও ধ্বংসাত্মক। তিনি গ্রামীণ বাংলার ধুলো, রোদ, শোষণ ও লজ্জা সবকিছু তুলে ধরেছেন নিখুঁত সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে।
‘গণদেবতা’ শুধুই অতীতের কথা নয়। ২০২৫-এর বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এখনো গ্রামের কৃষক ঋণে জর্জরিত, পঞ্চায়েত বা ইউনিয়ন পরিষদে পক্ষপাতিত্ব, ধর্ম নিয়ে বিভাজন, রাজনৈতিক দলগুলোর অপব্যবহার সব কিছু একই আছে। আজও গ্রামের এক কৃষক হয়তো থানায় যায়, বিচার পায় না। আজও কেউ প্রতিবাদ করতে চায়, কিন্তু গ্রামের মাতব্বর বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলে “চুপ থাকো, না হলে রেশন বন্ধ হয়ে যাবে।” এসব দৃশ্য যেন “গণদেবতা”-রই পুনরাবৃত্তি।
আবার উপন্যাসে যেমন শহর থেকে কিছু তরুণ আসে সমাজ বদলাতে, এখনো অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে গ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবতায় এসে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা, শুধু স্বপ্ন নয়, প্রয়োজন সুসংগঠিত গণজাগরণ—যা উপন্যাসেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তারাশঙ্করের ভাষা গভীর, বাস্তবতাপূর্ণ ও আঞ্চলিক। তিনি চরিত্রদের মুখে বাস্তব গ্রামের টোন তুলে এনেছেন “হেঁটে গেলেই বিচার হইব?” কিংবা “পেট ভরলে রাজনীতি বোঝা যায়”—এই ধরনের সংলাপ সমাজের স্তরভেদ তুলে ধরে। তাঁর বর্ণনায় নদী, ধানখেত, মেঘলা আকাশ, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর সবকিছু এমনভাবে আসে, যেন পাঠক নিজেই গ্রামে হাঁটছে। তাঁর ভাষা কখনো প্রতিবাদের, কখনো শোকের, আবার কখনো হতাশার এক নির্মোহ স্বরে কথা বলে।
‘গণদেবতা’ এমন এক উপন্যাস, যেটি সময়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এটি বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা শোষিত মানুষের কাহিনি, যেখানে নায়ক নেই, কিন্তু সংগ্রাম আছে। এখানে সাধারণ মানুষ যারা যুগ যুগ ধরে শোষণের শিকার তাঁরাই গণদেবতা। কিন্তু সেই দেবতা, তিনি দ্যুতি বিকিরণ করেন না, বরং ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও ন্যায্যতার অপেক্ষায় থাকা এক চেহারা। এটি আমাদের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর এক আহ্বান। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে সমাজের ভিত্তি দুর্বল, সেখানে উন্নয়ন কেবল মোহ, আর গণতন্ত্র কেবল শব্দ। এই উপলব্ধি যতদিন না গভীরে প্রবেশ করে, ততদিন “গণদেবতা” বারবার পড়া প্রয়োজন।


