রোহিঙ্গা শিবিরে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা মদত দিচ্ছে অভিযোগ – আরাকান আর্মির

ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ (আইসিজি) গত বুধবার ‘রোহিঙ্গা বিদ্রোহের ঝুঁকি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং ছয় মাস ধরে দূর থেকে পরিচালিত সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, বাংলাদেশে শরণার্থীশিবিরের চলমান অবস্থা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশঙ্কা ও সুযোগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ, আরাকান আর্মিসহ সব পক্ষের জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয় — বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ১০ লাখের বেশি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে এখন কার্যত আরাকান আর্মির শাসন চলছে। প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এখন রাখাইন রাজ্যে জরুরি পণ্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, ত্রাণ বিতরণেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রাখাইনে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ব্যাংকব্যবস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে আরাকান আর্মির কাছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কক্সবাজারের বিস্তৃত শরণার্থীশিবিরগুলোয় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ), রোহিঙ্গা ইসলামিক মহাজ, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি এবং মুন্নাহ গ্রুপের মতো কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন ও অপরাধী চক্র সক্রিয়।

২০২৪ সালের শুরুতে আরাকান আর্মি রাখাইনের রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। সে সময় রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় ।সেই সময়ে আরসা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ওই সময় আরও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যাদের বেশির ভাগই আসে গত বছর।

ভূ-উপগ্রহের তথ্যানুযায়ী, সে সময় রোহিঙ্গাদের ৩০টির বেশি গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। এ জন্য আরাকান আর্মির সেনাদের দায়ী করে রোহিঙ্গারা। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক গুরুতর চাপের মুখে পড়ে। ধারণা করা হয়, এখনো প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছে, যাদের বেশির ভাগই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় রয়েছে।

রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভেতর ক্ষোভ ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বাড়তে থাকে। একটি স্বতন্ত্র রোহিঙ্গা স্বদেশ গঠনের লক্ষ্যে শরণার্থীশিবিরে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে।ফলে শরণার্থীশিবিরগুলো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নতুন সদস্য সংগ্রহের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি আরাকান আর্মির ওপর হামলার পরিকল্পনাও করছে বলে আইসিজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আরসা ইতিমধ্যে উত্তর রাখাইনে হামলা চালানো শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে এবং সম্প্রতি আরাকান আর্মির যোদ্ধাদের ওপরও তারা হামলা চালিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে শরণার্থীশিবিরগুলো ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় যা ঘটছে, সেখানে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কিছুটা সহায়তা পাচ্ছে। কক্সবাজারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শরণার্থীশিবিরগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে।

রাখাইনে আরাকান বাহিনীর উত্থানের পর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের পথ ছেড়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা চুক্তির কৃতিত্ব দাবি করে ডিজিএফআই। সংস্থাটি এর নাম দিয়েছে ‘মিশন হারমনি’ এবং তাদের ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে দিল মোহাম্মদকে বিশ্বের সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশি কর্মকর্তারা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সমর্থন নেই। তবে সাবেক একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বলেন, ‘এসব স্থানীয় পর্যায়ে ঘটে। আমি ২০০ শতাংশ নিশ্চিত, এটা সরকারি নীতি নয়।’

সীমান্তের দুই পাশে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পটভূমি প্রস্তুত করতে আরাকান আর্মির সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ত হওয়ার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। কারণ আরাকান আর্মি মনে করে বাংলাদেশ, বিশেষ করে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো, তাদের (আরাকান আর্মি) প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

আরাকান আর্মির সামরিক শক্তি বিবেচনায়, রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সশস্ত্র সংগ্রাম সফল হবে না; বরং আরও বিপর্যয়কর পরিণতি নেমে আসতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড রাখাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সাথে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সম্পর্ক, আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের চেষ্টা এবং মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্রাইসিস গ্রুপ সুপারিশ করেছে — রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সদস্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে শরণার্থীশিবিরগুলোয় সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি উসকানিমূলক যেসব ভাষণ দিচ্ছে এবং বিদ্রোহ দানা বাঁধার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ঢাকার উচিত আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া, যার মধ্যে জান্তা সরকারের অবরোধে সরবরাহ ঘাটতিতে পড়া রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রাখা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন