রুডলফ জারিপভের – সাইবারনেটিক মিউজিক

১৯৫০-৬০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সাইবারনেটিক্স ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিকাশ ছিল রাজনৈতিক ও দার্শনিক বাধায় আবদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে রুডলফ জারিপভের অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনার কাজ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

নরবার্ট উইনারের প্রতিষ্ঠিত সাইবারনেটিক্স তত্ত্ব মূলত কম্পিউটার ও জীববিজ্ঞানের ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নে এটি পুঁজিবাদী পশ্চিমের ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়। বিশেষ করে ট্রোফিম লাইসেঙ্কোর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আধুনিক জেনেটিক্স ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানগুলোকে “বুর্জোয়া ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই মনোভাব সাইবারনেটিক্সকেও ‘বুর্জোয়া’ তকমা দিয়ে গবেষণার বাইরে ঠেলে দেয়।

স্তালিনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়। ১৯৫৫ সালে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সাইবারনেটিক্সের উপর আনুষ্ঠানিক সেমিনার শুরু হয়, যা এই ক্ষেত্রের গবেষণাকে বৈধতা দেয়। ঠিক তখনই রুডলফ জারিপভ তার অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনার কাজ শুরু করেন।

জারিপভের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সংগীতের নিয়মগুলোকে গণিতের ভাষায় রূপান্তর করা এবং কম্পিউটারে সেগুলো প্রয়োগ করা। তাঁর ১৯৬০ সালের একাডেমিক প্রকাশনায় সংগীতের প্রতিটি ফ্রেজের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলী বর্ণিত হয়েছে, যেমন কর্ডের ব্যবহার, ইন্টারভালের সীমাবদ্ধতা এবং সুরের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ। যদিও এই নিয়মগুলো প্রযুক্তিগতভাবে কঠোর, জারিপভের সংগীতজ্ঞ মনোভাব সৃষ্টিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় নান্দনিকতা বজায় রেখেছিল।

এই কাজের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন সংগীত রচনা কেবল আবেগনির্ভর সৃষ্টিশীলতা নয়, বরং নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ও নিয়মের মধ্য দিয়ে গঠিত একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া। এটি সাইবারনেটিক্সের মূল তত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে জটিল সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফিডব্যাক ব্যবস্থার গুরুত্ব থাকে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে সাইবারনেটিক্সের বিরুদ্ধে প্রচার ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ছিল মূলত একটি দার্শনিক ও আদর্শগত বিরোধ। সাইবারনেটিক্সের বহুমাত্রিকতা এবং জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের সম্ভাবনা সোভিয়েত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। বিশেষ করে, মানুষের শ্রমের গুরুত্ব কমিয়ে যন্ত্রের আধিপত্য বিস্তারকে তারা বিপজ্জনক মনে করেছিল।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও স্তালিনের মৃত্যুর পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে কিছুটা মুক্ততা আসে, যা জারিপভের মতো বিজ্ঞানীদের কাজের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। তাঁর ‘ইউরাল চ্যান্টস’ সোভিয়েত প্রেক্ষাপটে প্রথম কার্যকর অ্যালগরিদমিক সংগীতচর্চার নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমান যুগে সংগীত রচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক। ডিপ লার্নিং ও নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংগীতের বিশাল ডাটাসেট থেকে শেখার মাধ্যমে নতুন সুর তৈরি করা হচ্ছে। ট্রান্সফরমার মডেল যেমন ChatGPT-এর মতো ভাষা মডেল সংগীতের স্ট্রাকচার অনুকরণ করে নতুন সৃষ্টি করছে।তবে এই প্রযুক্তির উন্নতির মধ্যেও অনেক সংগীতজ্ঞ হতাশ। তারা মনে করেন, এআই-র তৈরি সংগীত অনেক সময় মানব সৃষ্টিশীলতার গভীরতা ও আবেগের অভাব বোধ করে। জন সাপকোর মতো সংগীতজ্ঞরা এআই-র সংগীতকে “তৃতীয় শ্রেণীর অনুকরণ” হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা প্রযুক্তির অপব্যবহার।

জারিপভের কাজ থেকে আমরা দেখতে পাই সংগীত রচনার প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতার মূল উৎস মানুষের আবেগ ও বোধ। জারিপভ নিজে বলেছেন, “যন্ত্র ও সাইবারনেটিক পদ্ধতি মানুষের সৃষ্টিশীলতার রহস্য উন্মোচনে শক্তিশালী সহায়ক, কিন্তু সংগীত তৈরির শিল্প মানুষেরই।”

রুডলফ জারিপভের অ্যালগরিদমিক সংগীত রচনা সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর রাজনৈতিক পরিবেশে প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তার কাজ সাইবারনেটিক্সের দার্শনিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সংগীতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তার চিন্তাধারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন মানবিক সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার স্থান অপরিবর্তিত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন