রুচি, শ্রেণী ও ক্ষমতার ত্রিভুজ ‘ক্রিঞ্জ’ সংস্কৃতি যা খুলে দেখায়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আবির্ভাবের ফলে গণমানুষের কণ্ঠস্বর আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ইনস্টাগ্রাম রিলসের জনপ্রিয়তা ছাড়ানোর অনেক আগেই, টিকটক সংক্ষিপ্ত ও নজরকাড়া ভিডিওর জন্য প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকাগুলোয় এর জনপ্রিয়তা ছিলো বিশাল। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিতর্কও সামনে আসে।

টিকটকের জনপ্রিয়তা অনেকেই প্রশংসার চোখে দেখেছিলেন, এটি কন্টেন্ট নির্মাণকে গণতান্ত্রিক করে তুলেছিল, যা আগে শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া ছিল। কিন্তু এই ‘নতুন’ কন্টেন্ট নির্মাতাদের অনেকেই ‘ক্রিঞ্জ’ এবং ‘ছাপরি’ বলে অবজ্ঞা করত। এটি ‘রুচি’ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। আমরা কী ধরনের বিনোদন গ্রহণ করি এবং এর পেছনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কী?নির্মাতাদের প্রতি উপহাস নিছকই ‘উন্নত’ রুচির প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সামাজিক বিজ্ঞানে রুচিকে আদর্শগতভাবে একটি শক্তিশালী সামাজিক চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। এটি শ্রেণি ও ক্ষমতার মানদণ্ড নির্ধারণের একটি মাধ্যম ।

পিয়ের বুদিয়ুর সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital) তত্ত্ব আমাদের এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করতে পারে। যদিও অনেক রক্ষণশীল মার্কসবাদী এই ধারণাটিকে অস্পষ্ট বলে মনে করেন, এটি শ্রেণিভিত্তিক সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।আমরা যখন কিছু গ্রহণ করি, এটি নিছক আমাদের চাহিদা পূরণের জন্য নয়-তা সে ব্যবহারিক হোক বা নান্দনিক। প্রতিটি ভোগের মধ্যে আমাদের পরিচয়ের একটি প্রকাশ ঘটে। এটি শ্রেণি-বৈষম্য তৈরি করে এবং বর্জনকে বৈধতা দেয়।

যখন আমরা এই ধারণাটি টিকটক কন্টেন্টের প্রসঙ্গে প্রয়োগ করি, তখন স্পষ্ট হয় যে এই উপহাস ও বিদ্রুপ শুধুমাত্র কন্টেন্টের গুণগত মান নিয়ে নয়, বরং কে এই কন্টেন্ট তৈরি করছে তা নিয়েই বেশি হচ্ছে। সাধারণত এই নির্মাতারা শ্রমজীবী, নিম্নবর্ণ ও গ্রামীণ পটভূমি থেকে আসেন। তাদের কন্টেন্ট অবশ্যম্ভাবীভাবে তাদের সামাজিক বাস্তবতার সাথে জড়িত থাকে এবং সাধারণত অত্যন্ত প্রকাশভঙ্গিমূলক হয় ‘উজ্জ্বল’ পোশাক, অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি ও অতিনাটকীয় পারফরম্যান্সের বৈশিষ্ট্যে ভরা।

‘ক্রিঞ্জ’ সংস্কৃতির প্রতি অভিজাতদের প্রতিক্রিয়াতে ইংরেজিভাষী অভিজাত শ্রেণি যখন এই ধরনের কন্টেন্ট দেখে, তারা সাধারণত নির্লিপ্ত থাকে না, বরং একে নস্যাৎ করতে তৎপর হয়। নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে অগ্রাহ্য করার এই প্রবণতা আসলে অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখার প্রচেষ্টারই অংশ।

অস্ট্রেলিয়ান সামাজিক গবেষক হিউ ম্যাককের মতে, আমরা যখন কিছু গ্রহণ করি বা প্রত্যাখ্যান করি, তখন আমরা আমাদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে একটি বিবৃতি দিই। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যখন নির্দিষ্ট কন্টেন্ট বা পণ্যকে ‘ক্রিঞ্জ’ বলে অবজ্ঞা করা হয়, এটি নিছক মানদণ্ডের প্রশ্ন নয় বরং এটি সামাজিক বিভাজন রচনার একটি প্রচেষ্টা হয়ে যায়।

সম্প্রতি, ‘ক্রিঞ্জ’ কন্টেন্ট গ্রহণের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে শহুরে জেন-জি-এর মধ্যে। তারা সরাসরি এই কন্টেন্টকে প্রত্যাখ্যান না করে বরং ‘বিদ্রূপাত্মক উপায়ে’ (ironical fashion) গ্রহণ করে। তারা এই কন্টেন্ট দেখে, শেয়ার করে, এমনকি নকলও করে, কিন্তু একটি শর্তে, এটি ‘সত্যিকারের’ উপভোগ নয়, নিছক বিনোদনের জন্য করা হয়। এই বিদ্রূপাত্মক গ্রহণযোগ্যতা অভিজাতদের জন্য বেশ কার্যকর: তারা এটি উপভোগ করতে পারে, কিন্তু একইসাথে সূক্ষ্মভাবে নিজেদের পৃথকও রাখতে পারে। এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শ্রেণিভেদ দূর করার পরিবর্তে আরও সুক্ষ্মভাবে তা দৃঢ় করে তোলে।

এই ‘ক্রিঞ্জ’ কন্টেন্টকে দূরত্ব বজায় রেখে গ্রহণ করার ক্ষমতাটিই সাংস্কৃতিক পুঁজির একটি সূক্ষ্ম রূপ হয়ে দাঁড়ায়। এটি বোঝায় যে কেউ সামাজিকভাবে এতটাই প্রভাবশালী যে সে অবচেতন সাংস্কৃতিক নিয়মগুলো বুঝতে পারে এবং তা অনুসারে আচরণ করতে পারে। সবচেয়ে ভাইরাল হওয়া ‘ক্রিঞ্জ’ কন্টেন্টগুলোই সাধারণত সেই কন্টেন্ট যা নান্দনিক মানের প্রচলিত ধারণাকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ করে। রুচি, ভোগ, শ্রেণি ও ক্ষমতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় আমরা কিছু শিল্পরূপ সত্যিই পছন্দ করি, কিন্তু সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ভয়ে তা প্রকাশ করি না। এটি সামাজিকভাবে অনুমোদিত মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে আমাদের রুচির কৃত্রিম উপস্থাপনাকে চিহ্নিত করে।

ফলে যাকে ‘ক্রিঞ্জ’ বলা হয়, তা নিছক নান্দনিক বিচার নয়, বরং এটি শ্রেণি ও জাতপাতের সীমানা সংরক্ষণের একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। সামাজিক মাধ্যম অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এই কারণে তারা নানা উপায়ে শ্রমজীবী সংস্কৃতির অবমূল্যায়ন করতে চায়-তা সরাসরি প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে হোক বা সূক্ষ্ম বিদ্রূপাত্মক ব্যবহারের মাধ্যমে ।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন