রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইক চালনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার ওপর এক কোটির বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। পরিবহন হিসেবে এদের ওপরই নির্ভরশীল শহরগুলোর বেশিরভাগ মানুষ। অথচ তাদের কর্মপরিবেশ, সুবিধা-অসুবিধা, নিরাপত্তা দেখা ও উন্নয়নের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নাই, বরং বিপরীতে রাষ্ট্র পরিচালিত হামলা, হুমকি, চাঁদাবাজীই প্রধান। ঢাকা শহরে থাকা প্রায় ২ লাখ অটোরিকশাসহ ১২ লাখ রিকশা রয়েছে ও সারা দেশে আনুমানিক ৪০ লাখ ইজিবাইক ও অটোরিকশা রয়েছে। সরকারি, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই এ সংক্রান্ত কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে- রিকশা চালানোর ফলে ঠান্ডা, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা, ডায়রিয়ার মতো রোগে ঢাকার ৯৪% রিকশাচালকই অসুস্থ থাকেন। এর মধ্যে ৩০% চালক আবার জন্ডিসে আক্রান্ত। কারণ, তাদের জন্য রাস্তাঘাটে সুপেয় পানির কোনো জোগান নেই, টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। এক গবেষণা থেকে জানা যায়- পায়ে টানা রিকশা চালিয়ে সংসারের মাত্র শতকরা ৬৮ ভাগ খরচের জোগাড় হয়, বাকি খরচের জোড়াতালি আসে প্রধানত গার্মেন্টস শ্রমিক স্ত্রী, কিংবা বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেওয়া স্ত্রীর আয়ের টাকা থেকে।
ঢাকা শহরের ৬৭.৭% রিকশাচালকই পরিজনহীন অবস্থায় থাকেন মূলত পরিবারসহ শহরে থাকার খরচ বাঁচাতে। গ্যারেজে ঘুমিয়ে, হোটেলে/মেসে খেয়ে যতটা সম্ভব টাকা আপনজনদের কাছে পাঠানো যায় সেই চেষ্টা করেন। তারা গড়ে প্রতি পাঁচ মাসে একবার বাড়ি যান। রিকশা টানতে প্রতি মিনিটে প্রায় ২৪ কিলোজুল শক্তি খরচ হয়, যা কিনা অলিম্পিকে অংশ নেয়া অ্যাথলেটের ঘামঝরানো পরিশ্রমের সমান। অন্য যানবাহনের অভাবে কিংবা তুলনামূলক সস্তা বাহন হিসেবে সহজপ্রাপ্তির কারণে, ঢাকাবাসীর ব্যক্তিগত যাতায়াতে রিকশা ব্যবহৃত হয় সর্বোচ্চ, যা যাতায়াতে মোট বাহন ব্যবহারের ৩৫%।
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ঢাকায় যে অন্তত ২ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে সেই প্রতিটি রিকশা মাসে গড়ে দেড় হাজার টাকা টোকেন বাণিজ্যের শিকার হয়। এই হিসাবে মাসে ৩০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে যাত্রী প্রতি কিমি তে বিদ্যুতের খরচ ০.২০ টাকার বিপরীতে পেট্রোলে চালিত থ্রি-হুইলার প্রতি যাত্রী প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ ০.৮৩ টাকা। কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ মাত্রা হিসেবেও বিদ্যুৎচালিত ইজিবাইকের তুলনায় পেট্রোলচালিত থ্রি-হুইলারের নিঃসরণ প্রায় দ্বিগুণ।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন ব্যবস্থায় রিকশা চালনা পেশা একটা সামাজিক সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে। ভূমিহীন কৃষক দুই ফসলের মাঝের সময়টায় শহরে চলে আসেন রিকশা চালিয়ে সংসারটাকে বাঁচিয়ে রাখতে, ছোট কিংবা মাঝারি কৃষক রিকশা চালাতে আসেন ফলনের ক্ষতি পোষাতে কিংবা পরের ফসল লাগানোর বীজ, সার, সেচের খরচ জোগাতে, কলেজ পড়ুয়া সন্তান দুই পরীক্ষার মাঝের সময়টায় চলে আসে শহরে রিকশা চালিয়ে পরের বছরের ভর্তি ফির টাকাটা জমিয়ে রাখতে। ত্রৈমাসিক সর্বজনকথায় প্রকাশিত মওদুদ রহমানের লেখার সংক্ষেপ।


