“ রাস্তায় নেমেছিল লাখো মানুষ এই সত্য তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি । ” – ভারতীয় গণমাধ্যম ও বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক : মাহফুজ আনাম

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রচারিত খবরগুলো আমার মতে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
১. শেখ হাসিনার সরকার পতনের ঘটনাটিকে পাকিস্তানের আইএসআই, বাংলাদেশের ইসলাম-পন্থী গোষ্ঠী বা চীনপন্থি শক্তির কাজ বলে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাদের লক্ষ্য ছিল ‘ভারতবান্ধব’ সরকারকে হটিয়ে ‘ভারতবিরোধী’ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণ মানুষ বা ছাত্রদের ভূমিকা, ছাত্রজনতা হত্যা এসব কোনো প্রসঙ্গ তাদের প্রতিবেদনে নেই। আন্দোলনের পেছনে বিদেশিদের হাত থাকার প্রমাণ কোথায়? এসব দাবির উৎস কী?অথচ, দোষারোপ থেমে নেই।
২. নতুন সরকার হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং এমনকি ‘গণহত্যা’ করছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিবিসিসহ বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকাররা এসব আখ্যানের অনেকগুলোই ভুল বলে প্রমাণ করেছে। তারপরও সেগুলোর প্রচার বন্ধ হয়নি, এমনকি কমেওনি।
৩. শেখ হাসিনা সরকার পতনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়টিও বলা হয়েছে। তারা এর সঙ্গে পাকিস্তানের ঘটনাগুলোর তুলনা করে দাবি করছে, ইমরান খানের সরকার পতন করার পর যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার সরকারেরও পতন ঘটিয়েছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্রজনতার আন্দোলন নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন :

১. ছাত্র-জনতার উত্তাল এই আন্দোলন বৃহৎ পরিসরে এড়িয়ে গেছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। …রাস্তায় নেমেছিল লাখো মানুষ এই সত্য তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। বরং তারা কেবল সরকার পতনের ঠিক পরপরই সংঘটিত হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোই দেখেছে। অথচ, এসব ঘটনা এমন এক সময় ঘটেছিল যখন দেশে কোনো সরকার ছিল না এবং পুলিশও ছিল অনুপস্থিত।
২. নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক গুলিবর্ষণ করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৭০০ জনকে হত্যা করা হলো, সেটা তাদের কোনো গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নেই বললেই চলে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর এমন বর্বর হত্যাযজ্ঞ বিরল। …ভারতের মূলধারার ছয়টি গণমাধ্যমে আমি সাক্ষাৎকার দিয়েছি, যেখানে তারা আন্দোলনের ব্যাপকতা বা বেসামরিক মানুষকে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করেনি, বরং শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা বা সরকারি সম্পত্তিতে হামলার মতো ঘটনাই তুলে ধরেছে।
৩. বাংলাদেশ সফরকারী ভারতীয় সাংবাদিকরা কেবল হিন্দুদের ওপর হামলার বিষয়টি নিয়েই প্রতিবেদন করেছে, উপেক্ষা করেছে শেখ হাসিনা সরকারের এত বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো। এর ফলে বাংলাদেশি পাঠকদের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৪. ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেবল বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিষয়ে আগ্রহী, পুরো দেশের মানুষের প্রতি নয়। তাহলে কি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক এগিয়ে যেতে পারবে? আগেও বলেছি এবং আবারও বলছি, ভারতের উচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে শেখ হাসিনার চোখে না দেখে গণতন্ত্রের চোখে দেখা।
৫. সম্প্রতি ভারতের সুপরিচিত গণমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রকাশিত ভিডিওতে বিজেপি নেত্রী ও আইনজীবী মীনাক্ষী লেখি বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের নাম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট পাকিস্তান করতে চান।’ তিনি এ তথ্য কোথায় পেলেন? তার এই বক্তব্যের উৎস কী? তার এই দাবি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং অপপ্রচারমূলক। শেখ হাসিনার বড় সাফল্যগুলো তুলে ধরার সময় তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কারচুপির মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিয়েছিলেন-অথচ এগুলোই শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ। দ্য ডেইলি স্টারে আমার টিমের সঙ্গে ৯ জুলাই থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রিন্ট ও অনলাইন প্রকাশিত ৫৬টি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সবই ‘মতামতভিত্তিক প্রতিবেদন’, ‘সংবাদ প্রতিবেদন’ নয়। অনেক শিরোনামের মধ্যে রয়েছে- ‘নির্বাচন এড়ানোর কৌশল হিসেবে সংস্কারের অজুহাত দিচ্ছেন ইউনূস’; ‘প্রতিশোধের রাজনীতি মন্ত্রীসহ ১৩ জন বিচারের সম্মুখীন’; ‘বাংলাদেশে কি গণতন্ত্র ফিরবে?’ ‘বাংলাদেশে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পেছনে চীন, আইএসআই’; এবং ‘শেখ হাসিনাকে সরিয়ে ভারতবিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠায় আইএসআইয়ের ষড়যন্ত্র’। এমনকি কিছু টেলিভিশন সংবাদে এটাকে ‘ইসলামপন্থীদের দখল’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর কোনোটিতেই বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করার কোনো চেষ্টাও ছিল না। এসব সংবাদের উৎস, উপস্থাপনা, শিরোনাম ও প্রতিবেদনের ভাষা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ভারতীয় জনগণের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি গভীর ঘৃণা সৃষ্টি করতেই এই আখ্যান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে বাংলাদেশে হিন্দুরা নিরাপদ নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন