“… গণ-অভ্যুত্থানের পাটাতনের ওপর প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণা ও কোনো কোনো উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ‘রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর’ ও ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা গত ৯ মাসে ক্রমেই হ্রাস পেয়ে চলেছে। এসব উপদেষ্টার সহযোগিতায় বরং কোনো কোনো প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
… অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক জমানার তুলনায় সাধারণভাবে অবশ্যই সম্প্রসারিত হয়েছে।…তবে সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি হিসেবে আমি জানি, সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী কোনো কোনো নেতা ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রতি খানিকটা বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এটা নিশ্চয় বিপজ্জনক লক্ষণ। এই লক্ষণের বিরুদ্ধে যৌক্তিকভাবে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা প্রয়োজন।
… কোনো স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম পরিচালনার প্রক্রিয়ায়, সংগ্রামীদের কারও কারও মননের ভেতর, তাঁদের অজান্তেই, কিছু কিছু স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার অনুপ্রবেশ ঘটে।…‘রাষ্ট্রবহির্ভূত’ কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত, এসব ননস্টেট ব্যক্তির কারও কারও ভেতর এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা কখনো কখনো ‘মব অ্যাকশন’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হলে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সচেতনভাবে সতর্কতার সঙ্গে ভাবাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা…করতে হবে। তবে প্রতিবাদী তারুণ্যের কোনো ন্যায়সংগত প্রতিবাদকে আমরা যেন ‘মব জাস্টিস’ হিসেবে চিহ্নিত না করি।
… আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে, প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে, রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগমূলক ক্ষমতার অপব্যবহার করে, রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত রেখে এ দেশে একটি লুটপাটতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। আবার এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে দমন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লীগ সরকার মাত্র তিন সপ্তাহে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২০ হাজার মানুষকে গুলি করে তাঁদের অনেককেই চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে।
এমন একটি রাজনৈতিক দলের স্বৈরতান্ত্রিক নেতা-নেত্রীসহ খোদ সেই দলটিকেও ‘সংগঠন হিসেবে’ বিচারের আওতায় আনাকে আমি একটি ন্যায্য পদক্ষেপ হিসেবেই গণ্য করি।…পৃথিবীর যেকোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার কর্তৃক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করা অন্যায়।
… বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থানের জন্য এ দেশের মানুষকে যে রক্তাক্ত স্বাধীনতাযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই যুদ্ধের সময় যারা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা-প্রয়াসের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তারা যখন ‘জাতীয় সংগীতের’ যাথার্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসৎ রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে ধরে নিতে হবে।
… স্বাধীনতা-পরবর্তী লীগের নানা রাজনৈতিক অপকর্মের বিরোধিতা করার নামে, খোদ স্বাধীনতাযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতাযুদ্ধের গণচেতনার বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেওয়ারও সুযোগ নেই।
… কোনো দেশের শাসকশ্রেণির বিভিন্ন দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সমাজে দীর্ঘকাল ধরে অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতন্ত্রী কিংবা কর্তৃত্ববাদী শোষণ-নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা জারি রাখে, তখন সে সমাজে প্রতিবাদী রাজনীতি হামেশাই ‘উগ্র রূপ’ ধারণ করে।…বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এবং এ দেশের মূলধারার রাজনীতি ও অর্থনীতির যথার্থ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভেতর দিয়েই কেবল এখন পর্যন্ত দুর্বল ‘উগ্রপন্থী’ রাজনীতি বিকাশের পথরোধ করা যেতে পারে।…গণতন্ত্রের তরফে, যেকোনো উগ্রবাদিতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হিসেবে সমাজে হাজির রয়েছে।
… কিছু সংস্কার জাতীয় নির্বাচনের আগে, আর কিছু পরে কার্যকর হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সংস্কারের নামে নির্বাচন প্রলম্বিত করা কিংবা নির্বাচনের নামে সংস্কারপ্রক্রিয়ায় বিঘ্ন তৈরি করা ঠিক হবে না।
… সরকারের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই আছেন, যাঁরা নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেশ কয়েক বছর ক্ষমতায় রেখে, নিজেদের নানা ব্যক্তিগত ও দলগত সুবিধা আদায় করতে চান। এ অবস্থায় নির্বাচনী শিডিউলের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষিত না হওয়ার কারণে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির গতিশীলতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই অনতিবিলম্বে এই সংশয় ও সন্দেহের নিরসন হওয়া প্রয়োজন।
… দু-একটা নির্দিষ্ট এলাকা বাদ দিলে, অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক নয়। দীর্ঘ ৯ মাসে রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিসরেই কোনো দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন নেই। সবকিছু পুরোনো পদ্ধতিতেই চলছে।
… রাখাইন রাজ্যের জন্য ‘মানবিক চ্যানেল’ দেওয়া-না দেওয়া বা বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করার মতো সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা দেশের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখতে বাধ্য। এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একা একা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ যখন একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন গণতন্ত্রপরায়ণ শক্তিসমূহের সম্মিলিত ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। “


