রাশিয়ার হুমকিতে শক্ত প্রতিরক্ষা শক্তি গড়ে তুলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে চায় জার্মানি

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের যে হুমকি সারা বিশ্বে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা বিশেষ করে ইউরোপেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণ, আগ্রাসী মনোভাব এবং পরবর্তী কর্মকাণ্ড বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, জার্মানির সামরিক প্রস্তুতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উঠে এসেছে। জার্মানির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল কার্স্টেন ব্রুয়ারের মতে, রাশিয়ার হুমকি থেকে জার্মানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করা জরুরি। তাঁর ভাষায়, “আমরা রাশিয়ার হুমকির সম্মুখীন।” তিনি সাবধান করে বলেন, ‘মাত্র চার বছরের মধ্যে এমন একটি আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে, যার জন্য ন্যাটোকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’

জার্মানির সামরিক ইতিহাস বেশ জটিল। দেশটির মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি চেয়েছিল আর কখনো সামরিক আগ্রাসন না করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে। তবে রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণ জার্মানির চিন্তাভাবনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত এখনো দেশটির মনোভাবের মধ্যে রয়ে গেলেও বর্তমানে পরিবর্তন ঘটেছে। গবেষক মার্কাস জিনার বলছেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পার হলেও, জার্মানদের মনে এখনো শান্তির প্রতি একটি বিশেষ ছাপ রয়ে গেছে।” কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং তার পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ জার্মানদের সামরিক প্রস্তুতির দিক থেকে ভাবনাচিন্তা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

বর্তমানে জার্মানির সামরিক বাহিনীর খুঁটিনাটি পরিস্থিতি তেমন ভালো নয়। সম্প্রতি জার্মানির সংসদে পাঠানো একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীতে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। গোলাবারুদ, সৈন্য সংখ্যা, এবং এমনকি ব্যারাকগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর কমিশনার ইভা হোগল জানিয়েছেন, এসব সমস্যার সমাধানে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি ইউরোর বাজেট প্রয়োজন। জেনারেল ব্রুয়ার জানিয়েছেন, জার্মানি এরই মধ্যে ঋণের সীমা তুলে নিয়েছে, যার ফলে প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় দিকগুলো পুরোপুরি পূর্ণ হয়নি এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

২০১৪ সালের ইউক্রেন সংকটের পর থেকে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার হুমকির দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। কিন্তু জার্মানি সেই সময় পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল রাশিয়ার সঙ্গে গণতান্ত্রিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, তবে রাশিয়ার আক্রমণ সব কিছু বদলে দেয়। বর্তমান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল পরিবর্তন করে ঘোষণা দেন যে, দেশের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে। রাশিয়ার আধুনিক যুদ্ধনীতি, বিশেষ করে সাইবার আক্রমণ, নাশকতা এবং ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা সমূহ জার্মানির জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে। জেনারেল ব্রুয়ার বলেছেন, “রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের মতো ছকবাঁধা চিন্তা করে না।” শান্তি আর যুদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, এটি একটি অবিরত প্রক্রিয়া। এমন পরিস্থিতিতে জার্মানি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করতে বাধ্য।

জার্মানির তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব হয়েছে। ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী শার্লট ক্রেফট বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা বিশ্বাস করতাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে নৃশংসতা গেছে তা শুধুমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে এখন মনে হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে লড়াই করতে হবে।” জার্মানির সেনাবাহিনীর নিয়োেগ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়। ইতিমধ্যেই সেনা সংখ্যা ২০ হাজার বাড়িয়ে ২ লাখ ৩ হাজার করার পরিকল্পনা করলেও, এই লক্ষ্যও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। জেনারেল ব্রুয়ারের মতে, বিশেষ করে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমা রক্ষা করতে জার্মানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন