রাজ্য রক্ষা আর যুদ্ধই ছিলো যে নারীদের জীবন উপনিবেশবাদের আতঙ্ক দাহোমি অ্যামাজন

১৮৮৯ সালের জুলাই, পশ্চিম আফ্রিকার বেনিন অঞ্চলের দাহোমি রাজ্য ফরাসি উপনিবেশবাদীদের আক্রমণের মুখে। ফরাসিরা ধারণা করেছিল, এটি হবে এক নিশ্চিত রক্তহীন বিজয়। কিন্তু তারা যা জানত না তা হলো-এই রাজ্যের প্রহরীদল পুরুষ নয়, শত শত প্রশিক্ষিত, নিষ্ঠুর ও রক্তপিপাসু নারী যোদ্ধা। তারা ছিল দাহোমি অ্যামাজন, আফ্রিকার ইতিহাসে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নারী সেনাবাহিনী।

দাহোমি রাজ্য (বর্তমানে বেনিন) ছিল ১৭শ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত এক সামরিক শক্তিধর রাজত্ব। সেখানে রাজা তার ব্যক্তিগত প্রহরী হিসেবে পুরুষ নয়, কঠিন ও শক্তিশালী নারী বাহিনী গড়ে তোলেন। এই নারীদের একমাত্র আদর্শ ‘N’Nonmiton’, যার অর্থ, ‘যদি রাজ্যের প্রয়োজন পড়ে আমরা আমাদের মা’কেও ধ্বংস করব।’ ইউরোপিয়ান পর্যবেক্ষকরা এদের ‘Black Amazons’ নামে আখ্যা দিয়ে গ্রীক পৌরাণিক নারী যোদ্ধাদের সাথেও তুলনা করে। তবে দাহোমি অ্যামাজনরা কোনো কল্পনা ছিল না-তারা ছিল যুদ্ধের জন্য গড়া এক বাস্তব নারী সেনাবাহিনী।

এই নারীদের প্রশিক্ষণ ছিল নির্মম ও কঠোর। কিশোরী বয়সেই তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে শুরু হতো দীর্ঘদিনের শারীরিক, মানসিক ও অস্ত্রচালনার অনুশীলন। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে কখনো কখনো জীবন্ত বন্দীর গলা কেটে ফেলতে বলা হতো যেন কোনো দয়া বা দ্বিধা না থাকে যুদ্ধক্ষেত্রে।

তাদের রক্তে ছিলো কেবল দায়িত্ব আর যুদ্ধ, প্রেম, পারিবারিক স্বপ্ন বা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার জন্য সেখানে কোনো স্থান ছিল না।। এই নারীরা বিবাহ করতেন না, সন্তান নিতেন না। তারা ছিল রাজার প্রতীকী স্ত্রী এবং রাজ্যের প্রতি সম্পূর্ণ উৎসর্গীকৃত। তাঁদের অস্তিত্বই যুদ্ধ, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের অপর নাম। দাহোমি অ্যামাজনরা সরাসরি আঘাত হানে সেই প্রথাগত বিশ্বাসে, যেখানে নারীত্ব মানে শুধুই কোমলতা, মা হওয়া বা সহনশীলতা। তারা প্রমাণ করে নারীত্বের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর প্রতিরোধশক্তি ও যুদ্ধক্ষমতা। ফরাসি সেনা ও ব্রিটিশ পর্যটকদের চোখে এই নারীরা ছিল ভয়ংকর এবং অস্বাভাবিক। ১৮৯০ সালে একজন ব্রিটিশ সৈনিক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন- ‘তারা ছিল পিশাচের মতো শক্তিশালী আর নারীর মতোই নিষ্ঠুর।’

দাহোমি অ্যামাজন একমাত্র নয়। আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে নারী যোদ্ধাদের বিস্ময়কর উপস্থিতি পাওয়া যায়। ঘানার রাণী আসান্তেওয়া ১৯০০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে ‘গোল্ডেন স্টুল’ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘যদি পুরুষরা যুদ্ধ না করে, তবে আমি আমার নারীদের নিয়ে যুদ্ধ করব।’ আলজেরিয়ার জামিলা বুহিরেদ ১৯৫০-এর দশকে ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়েন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে। বন্দী অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হলেও নত হননি। তিনি হয়ে ওঠেন উত্তর আফ্রিকার নারীমুক্তির এক প্রতীক। ইরিত্রিয়ার নারী গেরিলারা ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে ৩০ বছরের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারী যোদ্ধারা অংশ নেন বন্দুক হাতে। তারা চিকিৎসা, যোগাযোগ, সামরিক পরিকল্পনায়ও নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধশেষে তারা রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক স্তরেও অংশ নেন।

এইসব উদাহরণ দেখায়-আফ্রিকায় নারী মানেই কেবল ঘরকন্না নয়, বরং লড়াই, প্রতিরোধ ও নেতৃত্বের ধারক। তবে প্রশ্ন উঠে-এই ইতিহাস আমরা খুব একটা জানি না কেন? এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাসচর্চার রাজনীতি। যেখানে পুরুষ ইতিহাস লেখেন তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে। নারী যদি কেবল প্রেমিকা, স্ত্রী, বা উৎসর্গকারী সত্তা হয়ে থাকে-তাতেই পুরুষতান্ত্রিক বর্ণনাকাঠামোর সুবিধা। এইজন্যই দাহোমি অ্যামাজনের মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক নারীসেনা ইতিহাসের মূলধারা থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। আজ এই ইতিহাস ফিরে আসছে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায়। মার্ভেলের ‘Black Panther’ সিনেমার Dora Milaje বাহিনী স্পষ্টভাবে দাহোমি অ্যামাজনের অনুপ্রেরণায় গঠিত। সেখানে নারীরা রাজাকে রক্ষা করে, পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে এবং সাম্রাজ্যের রক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

২০২২ সালের “The Woman King’ সিনেমাও দাহোমি অ্যামাজনের জীবন ও লড়াই নিয়ে নির্মিত একটি আলোচিত চলচ্চিত্র। এতে উঠে আসে নারীর রাজনৈতিক, সামরিক ও মানসিক শক্তির বিস্তার। আফ্রিকার নারী যোদ্ধারা আমাদের সামনে এক বিকল্প নারীত্বের ধারণা হাজির করেন-যেখানে কোমলতা ও প্রতিরোধ পাশাপাশি চলে। তাদের অস্তিত্ব বলে দেয়, নারী কেবল সহ্যকারী নয়, তিনিই অনাগত জীবনের স্রষ্টা, প্রতিরোধকারী এবং যোদ্ধাও বটে। এই ইতিহাস কেবল অতীতের গৌরব নয়, বরং ভবিষ্যতের নারীবাদী প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক রসদ।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন