দৈনিক সমকালের রিপোর্টে বলা হয়েছে — আওয়ামী লীগ না থাকায়, আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার চেষ্টা করছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দলগুলো। এককভাবে কারো পক্ষে বিএনপিকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়। আদর্শিক ভিন্নতায় জোট সম্ভব না হওয়ায়, নানা মত এবং পথের দলগুলোর যতটা সম্ভব নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সংস্কার প্রশ্নেও এই দলগুলোর অবস্থান কাছাকাছি।
আপাতত এর অবয়বটা হলো– জামায়াতে ইসলামী বিএনপির মতো এককভাবে নির্বাচন করবে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলো একটা নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম গঠন করবে। আর সংস্কার আলোচনায় বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া মধ্যপন্থী দলগুলো নিয়ে পৃথক বলয় গঠনের চেষ্টা করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বিএনপির বিপরীতে এই তিন শক্তি আনুষ্ঠানিক কোনো জোট গঠন করবে না। কিন্তু তারা নির্বাচনে একে অন্যকে আসনভিত্তিক ছাড় দেবে। জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, এবি পার্টি এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি চিত্র পেয়েছে সমকাল। তাদের দাবি, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা কয়েকটি দলও বৃহত্তর সমঝোতায় যুক্ত হতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই দলগুলোর নেতাদের ভাষ্য, প্রাথমিক এই পরিকল্পনায় সব দল একমত হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। এই রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক সংস্কার প্রশ্নে আপাতত কাছাকাছি এসেছে। একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টায় যুক্ত দলগুলোর নেতাদের মতে, সংস্কারে বিএনপির অনড় অবস্থান বাকি দলগুলোকে আরও কাছাকাছি আনছে।
সমঝোতার চেষ্টা করা দলগুলোও জানে–বিষয়টি সহজ নয়। বিএনপি যাকে আসন দেবে, সেই দলই বিএনপির সঙ্গে চলে যাবে। এটিও জোটের চেষ্টা না করার কারণ। আসন বন্টন প্রশ্নে বিএনপির সাথে দর কষাকষির কৌশল হিসেবেও এই সমঝোতাকে কেউ কেউ কাজে লাগাতে পারেন।
নির্বাচনী সমঝোতার প্রচেষ্টা করা দলগুলোর নেতারা সমকালকে বলেছেন — দখল, চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনোখুনির ঘটনায় ১০ মাসে বিএনপির জনসমর্থন কমেছে। আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচন বর্জন করবেন, যেমনটা বিএনপি জোটের সমর্থকরা ২০২৪ সালে করেছিল। এ সমীকরণে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট দলগুলো এক হতে পারলে বিএনপিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তারা।
গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ায় মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই জীবনে প্রথমবারের মতো প্রকৃত অর্থে ভোট দেবেন। অন্য দলগুলোকে টিকতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কোনো দলের পক্ষে একা তা সম্ভব নয়। এ কারণেই বৃহত্তর সমঝোতার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ একজন নেতা সমকালকে বলেন, নির্বাচনকে ‘বিএনপি বনাম সবাই’– রূপ দিতে পারলে যে কোনো ফল সম্ভব। আর এই বার্তা দিতে পারলে দোদুল্যমান ভোটারদেরও সমর্থন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, বিএনপিকে হারানো সম্ভব– এই রব তুলতে না পারলে ভোট মিলবে না। ‘বিএনপিই সরকার গঠন করবে’– এই আওয়াজ থাকলে গ্রামগঞ্জের ভোটাররা অন্য কাউকে ভোট দেবে না।
নবগঠিত এনসিপির সঙ্গে এবি পার্টিসহ কয়েকটি দলের সমঝোতা হতে পারে। জামায়াত থেকে বেরিয়ে আসা নেতারা এবি পার্টি গঠন করেছে। এ দলটি যে বলয়ে থাকবে, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হবে জামায়াতের জন্য। এ তথ্য জানিয়ে এবির একজন নেতা বলেন–এবি পার্টিসহ মধ্যপন্থিদের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব, সেই প্রচেষ্টা চলছে।
সমমনা হয়েও গণঅধিকার, গণসংহতি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দল মৌলিক সংস্কারে বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এতে দলগুলোর সঙ্গে এনসিপি, এবি পার্টিসহ অন্যরা কাছাকাছি এসেছে। মধ্য এবং মধ্যবামপন্থি এই দলগুলোও সমঝোতার চেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপি ইতোমধ্যে গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে আসন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের সহায়তা করার জন্য স্থানীয় বিএনপিকে চিঠি দিয়েছে। জেএসপির আ স ম আবদুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর মান্না এবং গণসংহতির জোনায়েদ সাকিকে কর্মসূচি পালনে সহায়তার জন্য বিএনপি চিঠি দিয়েছে স্থানীয় নেতাদের।
একাধিক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, এ চিঠিই এখন তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির স্থানীয় নেতারা শত্রু ভাবছেন চিঠি নিয়ে আসা যুগপৎ আন্দোলনের সমমনা দলগুলোর নেতাদের।


