পদত্যাগের আলোচনার পর দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থানে রয়েছে।সরকার সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও ভোটের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা না করায় হতাশ-ক্ষুব্ধ বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের পথনকশার(রোডম্যাপ) দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে।
শনিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বা সরকার পদত্যাগ করবে না–এমন মত দিয়ে সরকারের কাজের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কঠোর হওয়ার বার্তা আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান সমকালকে বলেছেন, বৈঠকের ফলে উত্তেজনা কমলেও অনিশ্চয়তা দূর হয়নি, বরং বেড়েছে। খুব স্পষ্ট করে বললে, এই মুহূর্তে তিন শক্তি হলো – সরকার, সেনাবাহিনী এবং বিএনপি। এদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে অনিশ্চয়তা কাটবে না।
তিনি বলেন, বিএনপি যে উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছে, সেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে রেখে সরকার কঠোর হওয়ার বার্তাই দিয়েছে। শিগগির নির্বাচনী রোডম্যাপ না পেলে বিএনপিও যে কঠোর অবস্থানে যাবে, তেমন আভাস তারাও দিচ্ছে। তিন শক্তি কঠোর অবস্থানে থাকলে অনিশ্চয়তা কাটবে না। তাই স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ ঘোষণা করা উচিত।
রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি বলে মনে করছে বিএনপি। নির্বাচনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা আগের মতোই বলেছেন, আগামী বছরের জুনের আগে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন ডিসেম্বরে না হলেও জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারির মধ্যে হবে– এমন আশ্বাসও সরকারের পক্ষ থেকে আসেনি।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের উপস্থিতি ভালোভাবে নেয়নি বিএনপি–এ তথ্য জানিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, শনিবারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের বিবৃতিকেও বিএনপি ভালোভাবে নেয়নি।
বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে দলের আগের মতো হৃদ্যতা হয়তো থাকবে না। আবার সরকারও বিএনপির মতো বড় দলকে এড়িয়ে কিছু করার চেষ্টা করার সাহস দেখাবে না।
সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে বিএনপি। এখন পর্যন্ত দলটির অবস্থান হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে সভা-সমাবেশ-সেমিনারের মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখা।
এই বৈঠকের আগে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সরকারকে আরও দুই মাস সময় দেওয়ার কথা হয়। এর পরও নির্বাচনের রোডম্যাপ না হলে সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার এবং আন্দোলনের পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। আন্দোলনে জনসমর্থন ছাড়াও বন্ধু রাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তির সমর্থন আদায়ে তৎপরতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছিল স্থায়ী কমিটিতে।
গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সংস্কারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন সরকারের মূল লক্ষ্য। কিন্তু প্রশাসনসহ সব প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত হয়ে যাওয়ায় ভোট নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। ড. ইউনূস বলেন, এই দায় তিনি নিতে চান না।
একাধিক উপদেষ্টা বৈঠকে বলেন — বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসনের ৮০ ভাগ কর্মকর্তা বিএনপিপন্থি। নির্বাচন কমিশনও বিএনপির পক্ষে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে বিএনপি একচেটিয়া সমর্থন পাবে।
সরকারের দিক থেকে এ বক্তব্য আসার পর জামায়াতও বলছে, এ পরিস্থিতিতে সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। গত শনিবার জামায়াতের মজলিসে শূরার বৈঠকে আলোচনা হয়– রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরকারের উচিত কোন মাসে নির্বাচন হবে, তা স্পষ্ট করা। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াতই বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই আগামী নির্বাচনে দলটির ভালো করার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ভালো ভোট হতে হবে।
অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল এনসিপি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর নিজেদের অবস্থানে অনড় হয়েছে। দলটি বিচার-সংস্কার-নির্বাচনের সমন্বিত রোডম্যাপ চাইলেও সংসদের আগে স্থানীয় সরকারের ভোট, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ আমলের সব নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করার দাবি জুড়ে দিয়েছে। এসব দাবি নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েছে এনসিপি। আগামী ১৫ সপ্তাহে জেলা-উপজেলা কমিটি গঠন করে ছয় দাবি নিয়ে তৃণমূলে যাবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।


