রাগে চিৎকার – আপনার শিশুর শৈশব , ট্রমা হয়ে যাচ্ছে না তো ?

শিশুদের বড় করতে গিয়ে কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আমরা নিজেরাই নিজেদের চিনতে পারি না। একটানা কান্না, বারবার একই ভুল, বা সীমাহীন দুষ্টুমি—এসবের মাঝে কখন যেন গলার সুর চড়ে যায়। আমরা চিৎকার করি, অথচ কিছুক্ষণ পরেই সেই মুহূর্তটা আমাদের মাঝেও অপরাধবোধ রেখে যায়। আপনি একা নন। এই অভিজ্ঞতা অনেক অভিভাবকেরই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিৎকার কি আসলেই আমাদের শিশুর আচরণ পরিবর্তন করে? না, বরং তারা চুপ হয় ভয় পেয়ে, শেখে না বুঝে। এই ভয় এক সময় তাদের মনে ভেতরে ভেতরে ক্ষত তৈরি করে— যে ক্ষত একদিন বিষিয়ে তোলে শিশুর আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক এবং ভালোবাসা প্রকাশের পথ।

বিশ্বজুড়ে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা একমত যে, শিশুরা যা দেখে, তা-ই শেখে। যদি তারা দেখে বাবা-মা রেগে গিয়ে চিৎকার করেন, তাহলে তারাও তেমনই আচরণ শিখে। শুধু পরিবারে নয়, বাইরের জগতে, বন্ধুত্বে, এমনকি নিজের অনুভূতির প্রকাশেও তারা হয়ে ওঠে অস্থির ও প্রতিক্রিয়াশীল। তাই সন্তানের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখা। ড. লরা মার্কহ্যাম বলেন, “আপনার শিশু যদি আপনার ভালোবাসার কেন্দ্র হয়, তবে আত্মনিয়ন্ত্রণই তার চারপাশের নিরাপত্তা বলয়।”

তাহলে কিভাবে এই চক্র ভাঙা সম্ভব? নিজেকে সময় দিন:
রাগের মুহূর্তে সরতে শিখুন। গলা না চড়িয়ে নিজেকে স্থির করুন। এক কাপ পানি, কিছুক্ষণ নীরবতা বা অন্য ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ থাকা—এগুলো ছোট কিন্তু শক্তিশালী অভ্যাস।

অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন:
শিশুকে বলুন, “আমি রেগে গেছি কারণ…” এতে তারা শেখে—রাগ লুকোবার নয়, বোঝার বিষয়। তাদেরও নিজের অনুভূতি প্রকাশে উৎসাহ দিন।

শান্ত কিন্তু দৃঢ় আচরণ:
খারাপ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া দিন সম্মানজনক ভাষায়। চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন—এই আচরণ কেন গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে ভালো ব্যবহার হলে প্রশংসা করুন। ইতিবাচক ভাষাই গড়ে তোলে ইতিবাচক শিশু।

হুমকি নয় :
শাস্তি নয়—তাদের শেখান কাজের পরিণতি। খেলনা দিয়ে আঘাত করলে খেলনা কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখা যায়, সঙ্গে ব্যাখ্যা দিন—”খেলনা খেলবার জন্য, কাউকে আঘাত করতে নয়।”

মৌলিক চাহিদার যত্ন:
পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত রুটিন শিশুকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। উদ্বেগ কমে, আচরণও নিয়ন্ত্রিত হয়।

আর যদি আপনি কখনো চিৎকার করে ফেলেন?
স্বাভাবিক। কিন্তু শিশুর সামনে সরি বলুন। তারা শেখে—ভুল হওয়াটা সমস্যা নয়, তা স্বীকার করে ঠিক করাটাই আসল শিক্ষা। এবং যদি অনুভব করেন আপনার রাগ প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অথবা পরবর্তী সময়ে অপরাধবোধে ভোগেন—তাহলে থেরাপিস্টের সহায়তা নিন। এটি দুর্বলতা নয়, বরং সাহসিকতার প্রথম ধাপ। পরিবারের আবহ যদি হয় ভালোবাসায় পূর্ণ, কথা বলার সুযোগময়, যেখানে দোষ নয়—মাফের জায়গা বেশি, তবেই সেখানে শিশুরা বড় হয় আত্মবিশ্বাসে, মানবিকতায় এবং মমতায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন