মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাংলাদেশ হয়ে করিডর করে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে গেলে জাতিসংঘকে দুই দেশের সরকারের অনুমতি পেতে হবে। এই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ না হলে জাতিসংঘের সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত। জাতিসংঘের নেতৃত্বে এমন উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি নেই বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সকালে ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর দপ্তর প্রথম আলোকে এক বার্তায় এ তথ্য জানায়। জাতিসংঘের এই বার্তায় জানানো হয়, জাতিসংঘ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি তারা রাখাইনে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ তার মানবিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন জোরদার করবে।
রোববারের পর থেকে ‘মানবিক করিডর’ স্থাপনে অন্তর্বর্তী সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়, তাতে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল উদ্বেগ জানায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় বলা হয়, এ বিষয়ে আসলে কী হয়েছে, তা সরকারের কাছে জানতে চাইবে তারা। এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘রাখাইনে জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশ তাতে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী আছে। আমরা বিশ্বাস করি, জাতিসংঘের সহায়তায় মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা শরণার্থীদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।’
খলিলুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। তবে মানবিক সহায়তার রুটের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে, যা নিয়ে নানা পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হওয়া প্রয়োজন।’ রাজনৈতিক দলগুলো যা বলছে – গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকা মিয়ানমারের রাখাইনে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য শর্তসাপেক্ষে ‘মানবিক করিডর’ দেওয়ার বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে সম্প্রতি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর — “সরকারের উচিত ছিল, দায়িত্ব ছিল এই বিষয়টা নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলা। এটা অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা জড়িত। আমরা আরেকটা গাজায় পরিণত হতে চাই না। আমরা আরেকটি যুদ্ধের মধ্যে জড়াতে চাই না। আমাদের এখানে এসে আরও কেউ গোলমাল করুক, সেটিও আমরা চাই না। মানুষকে সাহায্য করার ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। জাতিসংঘ যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে এটা হতে হবে সব মানুষের সমর্থনে।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান —
“রাখাইনের সঙ্গে মানবিক করিডরের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ এর সঙ্গে অনেক নিরাপত্তা বিষয় জড়িত থাকতে পারে।” জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)-র যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ — “অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তামূলক নীতি গ্রহণে অবশ্যই ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। আলোচনা ব্যতিত এ ধরনের সিদ্ধান্তে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ইনটেগ্রিটি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক — “বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে, দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে হেফাজতে ইসলাম কোনোভাবেই এটি সমর্থন করে না। এর নিন্দা জানাই। আমরা এর প্রতিবাদ জানাবো।” সরকার যা বলছে – বিষয়টি নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনার পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে — মানবিক করিডর নয়, বরং রাখাইনে জাতিসংঘ সহায়তা দিতে চাইলে সেটা পৌঁছাতে পরিবহনসহ লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।
“আমরা এটা স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে সরকার তথাকথিত ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে জাতিসংঘ অথবা অন্য কোনও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেনি। রাখাইন রাজ্যে যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সাহায্য দেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে রাজি হবে, এটাই আমাদের অবস্থান,” মঙ্গলবার বলেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। রাখাইনে ত্রাণ পাঠানোর ব্যাপারে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব। তিনি আরো জানান — “বর্তমান পরিস্থিতিতে, রাখাইনে সহায়তা পাঠানোর একমাত্র কার্যকর রুট হলো বাংলাদেশ। …আর যে খবরগুলোতে কোনো বড় শক্তির জড়িত থাকার কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অপপ্রচার।”
তবে সরকার যদি ত্রাণ পাঠাতে ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে সহায়তাটি কেবলমাত্র বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। “আমরা মিয়ানমারের মাটিতে ঢুকবো না। যতটুক সহায়তা দেয়ার বাংলাদেশের ভেতরেই দেয়া হবে,” জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানের অফিস থেকে বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে খলিলুর রহমান মানবিক সহায়তা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিকল্প না থাকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ হচ্ছে একমাত্র চ্যানেল, যার মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। কারণ, রাখাইনের উপকূল এখনও তাতমাদোর (জান্তা বাহিনী) দখলে এবং অন্যান্য জায়গা দিয়ে সহজে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব নয়।”
তিনি তখন জানিয়েছিলেন যে, মানবিক চ্যানেল (প্রস্তাবিত করিডর) তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও আরাকান আর্মিকে জাতিসংঘই আলোচনায় বসাচ্ছে আর আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনায় জাতিসংঘকে মাঝামাঝি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।


