ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ। অন্যদিকে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্রই তৈরি করছে।
ইসরায়েলের নিজের দেশে পারমাণবিক অস্ত্র আছে কী না, সেটা কিন্তু তারা স্বীকারও করে না, আবার অস্বীকারও করে না। তবে আন্তর্জাতিক মহল বিশ্বাস করে যে, তাদের কাছেও আছে পারমাণবিক অস্ত্র।
লন্ডনের পত্রিকা দ্য সানডে টাইমস ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে একটা প্রতিবেদন ছেপেছিল, ‘রিভিলড্ – দ্য সিক্রেটস অফ ইসরায়েলস্ নিউক্লিয়ার আর্সেনাল’, অর্থাৎ ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন তথ্য ফাঁস। মনে করা হয়, এই খবরটি ব্রিটিশ সাংবাদিকতায় সবথেকে বড় ‘স্কুপ’ খবরগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা।
খবরের সূত্র ছিলেন ইসরায়েলি পরমাণু প্রকৌশলী মোরেখাই ভানূনু। অনেকেই যেটা সন্দেহ করতেন যে, ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়ে উঠেছে, সেই সন্দেহের নিরসন হয় তার ফাঁস করে দেওয়া তথ্য দিয়েই।
জেরুজালেমের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে নেগেভ মরুভূমির মাঝে অবস্থিত অতি গোপন ‘ডিমোনা পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ চাকরি করতেন মি. ভানূনু। ১৯৮৫-র শেষ দিকে মি. ভানূনু সিদ্ধান্ত নেন যে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এশিয়া-ভ্রমণে বেরবেন।
ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্যবহার করে আর তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প – এই দুটো বিষয়ই ইসরায়েলের প্রতি তার মোহভঙ্গ ঘটিয়েছিল।
চাকরি ছাড়ার আগে অবশ্য তিনি পারমাণবিক কারখানার ভেতরে ফিল্মের দুটি রোল ভর্তি ছবি তুলে নিয়েছিলেন। সেই সব ছবির মধ্যে যেমন ছিল অস্ত্র তৈরির জন্য কীভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিষ্কাশন করা হয় তার ছবি, তেমনই পরীক্ষাগারে বানানো থার্মোনিউক্লিয়ার যন্ত্রের একটা মডেলের ছবিও ছিল।
মি. ভানূনুর ওই সিদ্ধান্ত তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল লন্ডনে। দ্য সানডে টাইমসের খবর ছাপা হলো, তারপরই ইসরায়েলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ তাকে রোম থেকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে মি. ভানূনুর বিচার শুরু হয়। তার ১৮ বছরের জেলের সাজা হয়। জেলে থাকার প্রায় অর্ধেকটা সময় তাকে একা একটা সেলে বন্দী থাকতে হয়।
জেল থেকেই দেওয়া একটি রেকর্ড করা সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি বিশ্বকে জানাতে চেয়েছিলাম যে আসলে কী ঘটছে। এটা বিশ্বাসঘাতকতা নয়। ইসরায়েলের নীতির বিপরীতে গিয়ে আমি বিশ্বকে একটা তথ্য দিতে চেয়েছিলাম।”
জেল থেকে তিনি ছাড়া পান ২০০৪ সালের ২১শে এপ্রিল। তবে ইসরায়েল ছাড়ার অনুমতি তাকে কখনই দেওয়া হয় নি। মুক্তি পাওয়ার শর্ত ভঙ্গ করায় তারপরেও তাকে বেশ কয়েকবার জেলে যেতে হয়েছে।
সেদেশে মি. ভানূনুকে বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করা হলেও ২০০৪ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তার সমর্থকরা উৎসব পালন করেছিলেন। তাকে ‘শান্তির নায়ক’ নামে ডাকা হত। মুক্তি পাওয়ার পরে তার প্রথম সাক্ষাতকারে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, তার “কোনো অনুশোচনা নেই”।
“গোপনে কী কর্মকান্ড চলছে, সেটা বিশ্বকে জানিয়েছি আমি। আমি তো বলি নি যে আমাদের উচিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেওয়া হোক, কিন্তু ডিমোনা ধ্বংস করা হোক। আমি শুধু তুলে ধরেছি যে, এদের কাছে কী রয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার তো অন্যদের।”
ডিমোনা কারখানা গড়তে ফ্রান্সের সঙ্গে একটা গোপন চুক্তি করে ইসরায়েল। ধারণা করা হয় যে পারমাণবিক বোমার জন্য উপাদান তৈরির কাজ ৬০এর দশকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সেখানে। বহু বছর ধরে ইসরায়েল ওই কারখানাটিকে একটি কাপড় তৈরির কারখানা বলে প্রকাশ করতো।
সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল আ্যন্ড নন-প্রলিফারেশনের হিসাব অনুযায়ী, এখন ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক বোমা আছে।তবুও ইসরায়েল তার পারমাণবিক ক্ষমতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেই একটা অস্পষ্টতার নীতি নিয়ে চলে। ইসরায়েলের নেতারা অনেক বছর ধরেই বারবার একটা কথা বলে আসছেন যে, “ইসরায়েল কখনই মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকারী প্রথম দেশ হয়ে উঠবে না।”


