যেখানে কিছুই নেই সেখানেই সবকিছু ! নাথিংনেসের স্নায়ুবিজ্ঞান ও অস্তিত্বের গল্প

নাথিংনেস বা শূন্যতার ধারণা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শাস্ত্রজ্ঞ, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিকদের একটি প্রগাঢ় অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে আছে। গণিতে শূন্য প্রথম আত্মপ্রকাশ করে প্লেসহোল্ডার হিসেবে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয় সভ্যতায়। সুমেরীয়রা তাদের সংখ্যাপদ্ধতিতে একটি খালি অবস্থান চিহ্নিত করতে এই আদিরূপ ব্যবহার করত। তবে শূন্যকে একটি পূর্ণসংখ্যার মর্যাদা দেওয়ার ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে গড়ে ওঠে, যেখানে গাণিতিক নিয়মাবলির পাশাপাশি দর্শনেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভকরে।

পাশ্চাত্য দার্শনিকরা শুরুতে শূন্যকে গভীরভাবে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। পিথাগোরাস ও ইউক্লিডের মতো গ্রিক চিন্তাবিদরা শূন্যকে মূল্যহীন বা অস্তিত্বহীন বলে বিবেচনা করতেন, যেটা তাদের যুক্তিবদ্ধ বিশ্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তবে ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতির মাধ্যমে শূন্যের ধারণা প্রথমে ইসলামিক বিশ্বে এবং পরে ইউরোপে প্রবেশ করে। মধ্যযুগ পার করে আধুনিক ক্যালকুলাস, পদার্থবিজ্ঞান, কম্পিউটার প্রযুক্তি সবখানেই শূন্য একটি মৌলিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু শূন্য কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সসীম ও অসীমের মধ্যবর্তী সীমারেখার একধরনের দার্শনিক সংকেত, যেখানে ‘কিছু না থাকা’ও অসীম সম্ভাবনার উৎস।

অন্যদিকে স্নায়ুবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে নাথিংনেস বা অনুপস্থিতি কেবল বাহ্যিক বা শারীরিক শূন্যতার অভিব্যক্তি নয়। এটি মস্তিষ্কের একটি সক্রিয় প্রতিক্রিয়া। যখন আমরা কোনো কিছুর অভাব উপলব্ধি করি, তা হোক জ্ঞানীয় বা আবেগিক-তখন মস্তিষ্ক এক ধরনের জটিল স্নায়ুবিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে তা প্রক্রিয়াজাত করে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স দায়িত্ব নেয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মক্ষম স্মৃতি ও অনিশ্চয়তা মোকাবিলার, যেখানে হিপোক্যাম্পাস জড়িত থাকে স্মৃতি পুনর্গঠন ও স্থানিক সচেতনতার সঙ্গে। এই অভ্যন্তরীণ মস্তিষ্কীয় প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, অনুপস্থিতি নিজেই আমাদের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা শাণিত করার একটি তথ্য।

অনুপস্থিতির অনুভূতি শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, এটি আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রিয়জনের অনুপস্থিতি, কোনো স্মৃতির বিলুপ্তি, অথবা অস্তিত্বগত শূন্যতার উপলব্ধি মস্তিষ্কে বিষণ্ণতা, শোক, উদ্বেগ, এমনকি ভয় তৈরি করতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়াকে মস্তিষ্ক কেবল গ্রহণই করে না, বরং তা আবেগিক ব্যাখ্যার অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করে। অনুপস্থিতির অভিজ্ঞতা অনেক সময় স্মৃতির ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটায়। অ্যালঝেইমার বা মেমোরি লসের মতো অবস্থায় স্মৃতির শূন্যতা আত্মপরিচয়ের টেকসই কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

দর্শনের ক্ষেত্রে শূন্যতা এবং অস্তিত্বের সম্পর্ক চিরকালীন এক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। হাইডেগার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Being and Time-এ শূন্যতা বা নাথিংনেসকে অস্তিত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখান। তাঁর মতে মৃত্যুর পরবর্তী অনুপস্থিতির প্রত্যাশা আমাদের জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই দর্শনে শূন্যতা এক ধরণের বাস্তবতাবোধ, যা সব কিছুর অনুপস্থিতির মাঝেও উপস্থিতির অর্থ তৈরি করে। বৌদ্ধ দর্শনে শূন্যতা আরও ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। এখানে শূন্যতা মানে কোনো কিছুর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি সমস্ত বস্তুর স্বতন্ত্র অস্তিত্বহীনতার উপলব্ধি। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো কিছুকে আলাদাভাবে ধরে রাখা সম্ভব নয়, কারণ সবকিছু পারস্পরিক নির্ভরশীল। শূন্যতা উপলব্ধি করাই মুক্তির প্রথম ধাপ। এই দার্শনিক যুক্তি আধুনিক চেতনা-গবেষণার সঙ্গেও অসাধারণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চেতনার প্রসঙ্গে নাথিংনেস একটি অন্তজ্ঞানগত বাস্তবতা। চেতনা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় কোন তথ্য অনুপস্থিত, কোনটি উপস্থিত, এবং কোনটি পূর্বানুমানের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে তার ভিত্তিতে। ধ্যান, স্নায়ুবিক সংবেদনশীলতা কিংবা স্বপ্নাবিষ্ট চেতনার অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই এক ধরনের ‘শূন্যতা’র মুখোমুখি হই যেখানে চেতনা তথ্যহীনতার মধ্যেই অর্থ খোঁজে। এ উপলব্ধি আমাদের মনে মনে বলে দেয়, তথ্যের অনুপস্থিতিও কিন্তু একটি তথ্য! সবশেষে নাথিংনেসের ধারণাটি যে কেবল অনুপস্থিতির পরিচয় নয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিজ্ঞান, দর্শন ও মানসিকতার অন্তর্বতী বিশ্লেষণে। শূন্যতা একাধারে বুদ্ধিবৃত্তিক, জৈবিক, আবেগিক এবং অস্তিত্ববাদী একটি সঙ্কেত, একটি অভিজ্ঞতা, আরও সম্ভবত আমাদের চেতনার সবচেয়ে সূক্ষ্ম আয়না।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন