ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান যেন এক নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির সরকার ও জনগণের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যার প্রমাণ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর ইরানজুড়ে জাতীয় ঐক্যের এক বিরল প্রদর্শন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শান্তির আবরণ শিগগির গভীর সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। কেননা এই যুদ্ধ ইরানি সমাজ ব্যবস্থার গভীরে পরিবর্তন এনেছে। যুদ্ধ ইরানে কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সারা দেশের মানুষ, এমনকি রাজনৈতিক বন্দীদেরও যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য প্রদর্শনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত পেজেশকিয়ান যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণের সংযম ও ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেন – সরকার সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলেও জনগণ রাস্তায় নামেনি, ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।
তবে ইরান সমাজবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি সাঈদ মোইদফার সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি সরকার জনগণের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধের অবসান শান্তি নয়, বরং নতুন সামাজিক সংকটের সূচনা হতে পারে।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ও সংস্কারপন্থি গণমাধ্যমগুলো এই ঐক্যের আহ্বানকে প্রতিধ্বনিত করছে। দৈনিক ‘এতেমাদ’ ও ‘আরমান মেল্লি’ তাদের প্রথম পাতায় জাতীয় সংহতির প্রশংসা করেছে এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেছে। তেহরান সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা আজাদি মনুমেন্টের নিচে ‘ও ইরান’ নামে দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করেছে। বেশ কিছু শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎকারে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশংসা করেছেন। ‘এতেমাদ’ পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে তাঁদের ছবি প্রকাশ করেছে।
আরেকটি বিষয় হলো—যুদ্ধবিরতির পর ইরানের ইসলামিক মতাদর্শের ভাষা এক পাশে সরিয়ে এখন জাতীয় পরিচয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিরোনামগুলো এখন ‘ইরান’ শব্দ দিয়ে শুরু হচ্ছে, ‘ইসলাম’ শব্দটি এর পেছনে পড়ে গেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাম্প্রতিক ভাষণে ‘ইসলামিক ইরান’ শব্দযুগলটি মাত্র একবার ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ঐক্যের আহ্বানের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে একধরনের দায়বোধও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সরকার এখন জনগণের কাছে ঋণী। সংস্কারপন্থী সমাজবিজ্ঞানী হামিদ রেজা জালাইপুর বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে জনগণকে পুরস্কৃত করা সরকারের দায়িত্ব, যাতে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী হয়।’
এমনকি কিছু রক্ষণশীলও একই সুরে কথা বলছেন। এক সাবেক সম্পাদক স্বীকার করেছেন, এখন সরকারের পালা—যুদ্ধের সময় জনগণের সহনশীলতার প্রতিদান দেওয়ার।
জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য আহমদ বখশায়েশ বলেছেন, সরকারকে অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নতুনভাবে সাজাতে হবে। কমিটির আরেক সদস্য বেনাম সাঈদিও সরকারবিরোধীদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকৃতপক্ষে ইরানের সব নীতি নির্ধারণ করেন—সর্বোচ্চ নেতা খামেনি। তিনিই যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, তিনিই নীতিগত পরিবর্তনের একমাত্র ক্ষমতাধারী। এখন আপাতত শাসকগোষ্ঠী ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের ভাষা ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ছাঁচ কত দিন টিকে থাকবে বা এটি আদৌ কোনো বাস্তব পরিবর্তন বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।


