ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক খরচ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেও বলেছেন, এই প্রচেষ্টা দুর্বল ও অপর্যাপ্ত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে চতুর্থ বছরে। এ অবস্থায় ইউরোপ এখন এক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেটার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত নয়। ট্রাম্প – “আর ইউক্রেনের যুদ্ধ চলছে চার বছর ধরে, এই ধরনের কথা যখন উঠছে তখন ইউরোপ এক এমন যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, যার জন্য সে তৈরি না।”
২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থা একটি গুরুতর সতর্কবার্তা দেয়। তারা জানায় ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে, রাশিয়া মাত্র ছয় মাস বা তার কম সময়ের মধ্যে পাশের কোনো দেশে যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পার
দুই বছরের মধ্যে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলে আগ্রাসন শুরু করতে পারে। পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য না করলে তাহলে ইউরোপের ওপর আক্রমণ করতেও পারে। যদিও রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউরোপে আগ্রাসনের কোনো পরিকল্পনা করে না।
২০২৫ সালের ৫ মার্চ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রাশিয়ার যুদ্ধ-নির্ভর অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, রুশ আগ্রাসন “সীমান্ত চেনে না”।
“আজ কে বিশ্বাস করে যে রাশিয়া ইউক্রেনেই থেমে যাবে?”
— ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
এর পরের দিনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশ অতিরিক্ত সামরিক খরচে একমত হয়। প্রস্তাবের মধ্যে ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা।
“আমরা আবার অস্ত্রায়নের যুগে প্রবেশ করছি।”
— উরসুলা ভন ডার লেইন
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট
তবে সবাই একমত নয়। গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস মনে করেন, এই বড়সড় অস্ত্রায়ন অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অকার্যকর। কারণ ইউরোপের নেই পূর্ণাঙ্গ কোষাগার বা প্রকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন সংসদ।
তার মতে যুদ্ধের পরিবর্তে রাশিয়া ও চীনকে যুক্ত করে শান্তি আলোচনা হওয়া উচিত যেখানে ইউক্রেন থাকবে নিরপেক্ষ ও সার্বভৌম।
“ইউরোপকে সত্যিকারে শক্তিশালী করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে অস্ত্র কিনা নয়, বরং গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলা।”
— ইয়ানিস ভারুফাকিস
অধ্যাপক, এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়
এই বিতর্ক চলাকালেই রাশিয়ার সীমানাঘেঁষা পাঁচটি দেশ ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন নিষিদ্ধকারী ওটাওয়া চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়।
“এর ফলে এই অঞ্চল আগামী কয়েক দশক ধরে সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
— লয়েড অ্যাক্সওয়ার্থি
সাবেক কানাডীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধের প্রস্তুতির আওয়াজ শুনছে ব্যবসা-বাণিজ্য জগতও। ইউরোপের সবচেয়ে বড় বন্দর রটারডাম ইতিমধ্যেই সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করেছে এবং যুদ্ধ শুরু হলে কার্গো অন্যত্র সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৫ কোটি নাগরিককে এখন অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুত রাখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে যেমন পানীয় জল, টিনজাত খাবার ও ওষুধ।
“প্রস্তুতি আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উচিত, প্রত্যেকেরই এখানে ভূমিকা রয়েছে।”
— হাজা লাহবিব
ইউরোপীয় কমিশনার (প্রস্তুতি ও সংকট ব্যবস্থাপনা)
যখন সর্বত্র যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা শোনা যাচ্ছে, তখন মনে পড়ে এক প্রাচীন রোমান লেখক ভেজেটিয়াসের কথা, যিনি ৪র্থ বা ৫ম শতকে লিখেছিলেন: “যদি তুমি শান্তি চাও, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।” আজ, অধিকাংশ ইউরোপীয়ের কামনা ভেজেটিয়াস যেন ঠিকই বলেন


