১৪১৫ সাল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে চলছে শতবর্ষীয় যুদ্ধ। অ্যাজিঙ্কোর্টের যুদ্ধে ইংরেজ সেনারা সংখ্যায় কম, ক্লান্ত এবং প্রায় হারার মতো অবস্থা। কিন্তু হেনরি পঞ্চম হঠাৎ তাঁর সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, “ঈশ্বর আমাদের সাথে আছেন।” পরদিন যুদ্ধ জিতে যায় ইংল্যান্ড। কেউ বলে কৌশল, কেউ বলে কাকতালীয়। কিন্তু বিজয়ীরা যেটা বলেছিল তা ছিল সরল, “ঈশ্বর আমাদের পাশে ছিলেন।”
এই এক লাইন দিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ ও ‘ঈশ্বর’ বা ‘দিব্যতা’র মধ্যকার সেই অদ্ভুত সম্পর্কের ইতিহাস, যেখানে ঈশ্বর কেবল মন্দিরে নন, ছিলেন রণক্ষেত্রেও।
মানুষ যখন যুদ্ধ করে, তখন সে প্রায়ই ভাবে যে সে ন্যায়ের জন্য লড়ছে। আর ন্যায় মানেই ঈশ্বর। ফলে যুদ্ধের সময় দুপক্ষই দাবি করে ঈশ্বর তাদের পক্ষে। ইতিহাস জুড়ে দেখা যায় দেবত্ব কেবল বিশ্বাস নয়, কৌশলও।
ক্রুসেডের কথাই ধরুন। খ্রিস্টানদের পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত এই লড়াইয়ের একেকটা ধাপে ‘পোপ’ নিজে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে যুদ্ধের অনুমতি দিতেন। আর মুসলিম সেনারা বলতেন, তাঁরা “আল্লাহর পথের যোদ্ধা”। এইসব যুদ্ধের শেষে কত মানুষ মরেছে, কত মসজিদ, গির্জা ধ্বংস হয়েছে, তার হিসাব নেই। কিন্তু দুইপক্ষই ভেবেছে ঈশ্বর তাঁদের পক্ষেই ছিলেন।
মানসিকভাবে যুদ্ধ এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার স্থান। সৈনিক জানে সে যে কোন দিন মারা যেতে পারে। এই ভয়, অসহায়তা ও মৃত্যুভীতি থেকে মুক্তি পেতে তারা ধর্মের কাছে যায়। ধর্ম আশ্বাস দেয় “তোমার মৃত্যু অর্থহীন নয়, ঈশ্বর জানেন তুমি কী করছো।” ধর্ম শুধু সাহসই দেয় না, ন্যায্যতা’র ঢাল হিসেবেও কাজ করে। যখন কেউ শত্রুকে হত্যা করছে, তখন সে বিশ্বাস করতে চায় এই হত্যাও এক ধরণের পবিত্র কাজ।
অনেকেই ভাবেন আধুনিক যুগে আর ঈশ্বরের ব্যবহার নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বলেছিলেন “God told me to end the tyranny in Iraq.” অন্যদিকে আল-কায়েদার হামলাকারীরাও বলেছিল তারা জিহাদে অংশ নিয়েছে, যেখানে শহিদ হওয়া মানে স্বর্গে যাওয়া। দুই পক্ষই ঈশ্বরের নামে যুদ্ধ করেছে। আবার দু’পক্ষই একে অপরকে শয়তান বলেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের যুদ্ধ ইতিহাসেও ঈশ্বরের ভূমিকা রয়েছে। মহাভারতে কৃষ্ণ নিজে যুদ্ধের রথ চালাচ্ছেন, অর্জুনকে গীতা বলছেন “তোমার কর্তব্য যুদ্ধ করা।” এই গীতার বাণী আজও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে উদ্ধৃত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কামিকাজে পাইলটরা সম্রাটকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন। তাদের জন্য আত্মত্যাগ মানেই ঈশ্বরের প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য। তারা বিমানে উঠে আত্মঘাতী মিশনে যেতেন, তাদের শেখানো হতো “এই মৃত্যু তোমাদের পরকালকে পবিত্র করে তুলবে।”
একটা প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে, এসব ‘ঈশ্বরের যুদ্ধে’ নারীর ভূমিকা কী ছিল? ক্রুসেডের সময় অনেক নারী নিজ সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে তারা ‘ঈশ্বরের পুরস্কার’ পাবেন। আবার আফ্রিকার কিছু আদিবাসী যোদ্ধ্রী নারী নিজেদের ‘ঈশ্বরী’ বলেই দাবি করতেন। ডাহোমির অ্যামাজন নারীরা যুদ্ধের আগে আধ্যাত্মিক আচার করতেন এবং নিজেদের দেবীর অবতার হিসেবে দেখতেন।
তাহলে ঈশ্বর কি কখনও যুদ্ধ থামাতে পারেননি?
এই প্রশ্নই হয়তো সবচেয়ে অদ্ভুত এবং গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রিসমাস ডে তে একটি ঘটনা ঘটে, একে বলা হয় “Christmas Truce”। জার্মান ও ব্রিটিশ সেনারা হঠাৎ করেই গোলাগুলি বন্ধ করে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়, উপহার দেয়, ফুটবল খেলে। কেউ কেউ বলেন ঈশ্বর সেইদিন যুদ্ধে সত্যিই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরদিন আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এমনও অনেকে বলেন, যুদ্ধ কখনোই ঈশ্বরের ডাকে সম্ভব না। সবই মানুষের শয়তানতুল্য স্বার্থ। তবে ইতিহাস বলে ঈশ্বরকে সামনে রেখেই মানুষ যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়। সেই ঈশ্বর কখনও ইসলামের, কখনও খ্রিস্টানদের, কখনও ব্রাহ্মণের, কখনও সম্রাটের রূপে হাজির হন।
ঈশ্বরের নামেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর একেক সময় একেকভাবে দেওয়া যায়। কেউ বলবে মানুষ ঈশ্বরের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। কেউ বলবে ঈশ্বর কেবল একটি প্রতীক, যুদ্ধ আসলে ক্ষমতার খেলা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট ঈশ্বর থাকেন যুদ্ধের প্রার্থনায়, সৈনিকের ওজনে, নেতার ভাষণে এবং সাধারণ মানুষের আশায়। তাঁকে ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করে, আবার তাঁর কাছেই মাফ চায়। এই দ্বন্দ্বই ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত সত্য। যেখানে ঈশ্বর আছেন কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কোন পক্ষে আছেন!


