অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কৃষি খাতকে দখলে নিতে চাইছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কৃষি খাতে প্রবেশ করবে, যা দেশের কৃষি স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বুধবার ঢাকায় প্রেস ইনস্টিটিউটে নাগরিক উদ্যোগ ও পিপলস হেলথ মুভমেন্ট আয়োজিত “বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্ধারণী উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ ও দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বিষয়ে সতর্ক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এসব মন্তব্য করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন এবং বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ড. মোশাহিদা সুলতানা, ডা. জাহেদ মাসুদ, গওহর নইম ওয়ারা ও সালাউদ্দিন বাবলু। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরকত উল্লাহ মারুফ এবং কারিগরি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন সানিয়া রিড স্মিথ।
ফরিদা আখতার জানান, ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, তারা কৃষিতে জিএমও আনার জন্য দৃঢ় মনোভাব নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমার মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয় না হওয়ায় আমি এ বিষয়ে সরাসরি কিছু করতে পারছি না, তবে যে কথাবার্তাগুলো হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র কৃষি খাতকে দখলে নেবে এবং তাদের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্রাজিল ও জাপান যদিও নিজেদের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আলোচনা করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনও শর্ত ঠিক করে, তা মানতেই হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বা গোপন চুক্তি গ্রহণের বিরোধিতা জানান এবং নাগরিক হিসেবে অসহায় বোধ করছেন।
ফরিদা আখতার বাংলাদেশের মাংস আমদানি বিষয়েও সতর্কবার্তা দেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস আমদানি করলে বাজারে গরুর মাংসের দাম কমে ৩০০ টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে ৭০০–৮০০ টাকার মধ্যে। তবে দেশীয় গবাদিপশুর বাজারে এর প্রভাব পড়বে এবং লাখ লাখ খামারি, বিশেষ করে গরীব মহিলা উদ্যোক্তাদের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, বিদেশি মাংস আমদানিতে জুনোটিক রোগের ঝুঁকিও রয়েছে।
উপদেষ্টা স্বতন্ত্র কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের গুরুত্বে জোর দেন। তিনি বলেন, সাগরের সি উইড ও কুচিয়া রপ্তানিতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে এবং আমদানি কমাতে দেশীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি জরুরি। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের ফলে শুল্ক ও জিএসপি সুবিধার প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সভায় মন্তব্য করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি দ্বিপাক্ষিক গোপন বাণিজ্য চুক্তি জনগণের সামনে প্রকাশ করতো, তবে বাংলাদেশের গোপন চুক্তির প্রথা অনেকাংশে বন্ধ হতো। তিনি এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জোর দেন। ফরিদা আখতার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশকে স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণ করতে হবে, দেশীয় কৃষি ও মৎস্য খাতকে শক্তিশালী করতে হবে এবং বিদেশি প্রভাব থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।


