বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও দারুণ গতি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬.৯৯% বেড়ে ৩.৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোস্টাটের বরাতে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এসব তথ্য জানিয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি — যা বাংলাদেশের বাজার দখলের সক্ষমতা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের বাজার শেয়ার কমার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান দখলে বাংলাদেশ সফল হয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি যতটা না দামে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণনির্ভর। ইইউ বাজারে ইউনিট দামে গড়ে ১.৪৬% হ্রাস পেয়েছে, অথচ পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি ৩৯.০২%। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ক্রেতাদের চাহিদামতো সাশ্রয়ী দামে পণ্য সরবরাহ করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তারপরও চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৭.২৩%, রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক মন্দা ও কিছু সুরক্ষাবাদী-নীতির মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের টেকসই প্রতিযোগিতাশক্তির প্রমাণ দিচ্ছে।
বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একাধিক শক্ত ভিত। এগুলো হলো — উচ্চমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন। পরিবেশবান্ধব কারখানা (গ্রিন ফ্যাক্টরি)। সামাজিক ও শ্রমিক নিরাপত্তায় অগ্রগতি। দ্রুত ডেলিভারি সক্ষমতা। ইইউতে জিএসপি সুবিধা তথা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। ইইউ’র বাজারে চলতি সময়ে চীনের রফতানি বেড়েছে মাত্র ২৫%, যা দাঁড়িয়েছে ৪.৫৪ বিলিয়ন ডলারে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৭%, যা স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে। তুরস্কের রফতানি কমেছে ৩.৬৪%। ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া ২১-২২% হারে বাড়লেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রেও চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য কমছে। ২০১৮ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রফতানি ছিল বাংলাদেশের তুলনায় ৫ গুণ বেশি, ২০২৪ সালে সেই ব্যবধান কমে এসেছে মাত্র ২ গুণে। বাংলাদেশের রফতানি দাঁড়িয়েছে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারে এবং চীনের কমে ১৬.৫০ বিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ১৫.০৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেক (৪৯.৮২%)। বিজিএমইএ’র তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যেও রফতানি বেড়েছে, যদিও হার তুলনামূলকভাবে কম— মাত্র ৪.১৪%। অন্যান্য বাজার যেমন- জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতেও রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ৬.৬৬%।
উদ্যোক্তারা বলছেন — বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে ক্রেতারা বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে নতুন কার্যাদেশ আসার সম্ভাবনাও বাড়ছে। তবে প্রতিযোগিতা, শুল্কনীতি পরিবর্তন এবং ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব। এজন্য নতুন বাজারে প্রবেশ ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে।


