যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। এই ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।বিবৃতিতে ড. ইউনূস লেখেন, ‘আমাদের অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ায় মহামান্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ। আপনার বাণিজ্য এজেন্ডার সমর্থনে আমরা আপনার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাব।’
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত ৭ এপ্রিল ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টাপাল্টি শুল্ক পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। চিঠিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন, অন্তত ৯০ দিনের জন্য এই শুল্ক স্থগিত রাখা হোক, যাতে উভয় দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। চিঠিতে ড. ইউনূস উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি আগ্রহ তুলে ধরা। বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে মার্কিন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করে এবং যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়।
এছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, যা মার্কিন এলএনজি রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যড়বিশেষ করে তুলা, গম, ভুট্টা ও সয়াবিন-আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা মার্কিন কৃষকদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করবে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত সংরক্ষণাগার (বন্ডেড ওয়্যারহাউস) চালু করার পরিকল্পনা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি, গ্যাস টারবাইন, সেমিকন্ডাক্টর ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো শীর্ষ মার্কিন রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ কমানোর কাজও চলমান রয়েছে।
ড. ইউনূস আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ পণ্যের ওপর বাংলাদেশে শুল্কহার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। এছাড়া, অশুল্ক বাধা দূর করার জন্য বাংলাদেশ কিছু পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে এবং প্যাকেজিং, লেবেলিং ও সনদ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজতর করেছে। কাস্টমস ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি জানান। চিঠিতে উল্লেখযোগ্য একটি দিক ছিল বাংলাদেশে স্টারলিংক চালুর অগ্রগতি। ড. ইউনূস জানান, এই প্রক্রিয়ার বেশিরভাগ অংশ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে আরও বৃহৎ বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সবশেষে ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন যে, উল্লিখিত সব কার্যক্রম চলতি ত্রৈমাসিকের মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে।এজন্য সামান্য সময় প্রার্থনা করে তিনি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে আরোপিত পাল্টা শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিবৃতিতে জানান, ৭৫টিরও বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং কেউ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বলেই তিনি এই শুল্ক স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ৯০ দিনের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর থাকবে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসকৃত। এই পদক্ষেপকে পর্যবেক্ষকরা যুক্তরাষ্ট্র-বিশ্ব বাণিজ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন।


