যুক্তরাষ্ট্রে প্রজনন হার রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার “প্রতিস্থাপন হার”- এর অনেক নিচে। এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি দুনিয়ায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে প্রোন্যাটালিজম আন্দোলন। ইলন মাস্ক যার সন্তান সংখ্যা এখন ১৩, তিনি এই আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক। এর মূল ধারণা হলো সমাজের পতন রোধ করতে বেশি করে সন্তান জন্ম দেওয়া। ওপেনএআই সিইও স্যাম অল্টম্যানও বলেছেন, “অবশ্যই আমরা বড় পরিবার গড়ে তুলব,” এবং তিনি পরীক্ষামূলক প্রজনন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছেন। প্রোন্যাটালিজমের অন্যতম প্রবক্তা ম্যালকম কলিন্সের মতে, অনেক প্রযুক্তি মোগল এই আন্দোলনের প্রতি গোপনে সমর্থন জানাচ্ছেন যা ব্যক্তিগত সম্মেলন ও বিনিয়োগকারীদের বৈঠকে প্রকাশ পাচ্ছে।
স্ট্যানফোর্ড থেকে এমবিএ করা প্রাক্তন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট কলিন্স বলেন, “যারা আত্মত্যাগ করতে রাজি এবং এই আন্দোলনকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করবে, তারাই ভবিষ্যতে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।” তার মতে, প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্তত অর্ধেক মানুষই প্রোন্যাটালিস্ট।৩৮ বছর বয়সি কলিন্স ও তার স্ত্রী সিমোন (৩৭) বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সি চার সন্তানের বাবা-মা এবং যতদিন সম্ভব, যত বেশি সন্তান নেওয়া সম্ভব, তা গ্রহণ করার পরিকল্পনা করেছেন। তাদের বিশ্বাস জনসংখ্যা কমে যাওয়া মানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক সেবার ওপর চাপ এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়-এবং এসবের সমাধান ভবিষ্যতমুখী প্রজনন প্রযুক্তিতে নিহিত।
এই ইস্যুতে সচেতনতা বাড়াতে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন-নিয়মিত পডকাস্ট “বেসড ক্যাম্প”, যৌথভাবে লেখা পাঁচটি বই এবং প্র্যাগম্যাটিস্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যেখানে সারোগেসি, প্রজনন প্রযুক্তি ও শিশু প্রতিপালন নিয়ে গবেষণা করা হয়।২০১২ সালে কলিন্স যখন স্ট্যানফোর্ডে এমবিএ করছিলেন, তখন সান ফ্রান্সিসকোতে সিমোনের সঙ্গে তার দেখা হয়। সিমোন, যিনি কেমব্রিজ থেকে প্রযুক্তি নীতি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন, তিনি কখনো পরিবার গড়তে চাননি।”আমি সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় বেড়ে উঠেছি, যেখানে সবাই চায় একটা কোম্পানি শুরু করতে এবং সারা জীবন একা থাকতে,” বলেন সিমোন। যিনি সাক্ষাৎকারের সময় ট্রেডমিলে হাঁটছিলেন, পিঠে একটা শিশু বাঁধা অবস্থায়।
কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, যখন ম্যালকম দক্ষিণ কোরিয়ায় এক ভিসি ফার্মে কাজ করতে যান।দক্ষিণ কোরিয়া গত বছর জনসংখ্যা সংকটকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। কারণ অনুমান করা হচ্ছে আজকের প্রতি ১০০ জন কোরিয়ানের জন্য ভবিষ্যতে মাত্র ৪ জন নাতি-নাতনি থাকবে। প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল নবজাতকের পরিবারগুলোকে আবাসন ভাতা ও বাড়তি মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।জাপানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় চারগুণ বেড়েছে। যেখানে শিশুর অনুপাত অর্ধেকে নেমে এসেছে ম্যালকম মনে করেন পশ্চিমা বিশ্বও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জন্মহার প্রতি নারী ১.৬, যা ২.১-এর প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন হারের নিচে।
প্রাকৃতিকভাবে সন্তান নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৭ সালে কলিন্স দম্পতি তাদের সমস্ত সঞ্চয় আইভিএফ (In Vitro Fertilization) চিকিৎসায় ব্যয় করেন।ম্যালকম বলেন, “ভ্রূণ তৈরি করা এত ব্যয়বহুল যে আমরা একটা স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের মেঝেতে গদি পেতে থাকতাম। মানুষ বলে, ‘আমার সন্তান নেওয়ার টাকা নেই।’ কিন্তু আসলে তারা বলতে চায়, ‘আমি আমার জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে চাই না।”সিমোনের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। তিনি বলেন, “সংক্ষিপ্তমেয়াদী আরামের জন্য-বেশি ট্রিপ, বেশি ছুটি, ভালো বাসস্থান, ভালো খাবার-একটি নতুন মানবজীবন সৃষ্টি করার সম্ভাবনাকে ত্যাগ করা হাস্যকর।”
জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক রবিন হ্যানসন সতর্ক করেছেন, “জনসংখ্যা হ্রাস অর্থনীতিকে উল্টে দিতে পারে এবং উদ্ভাবন থমকে যেতে পারে।”এই উদ্বেগই প্রযুক্তি বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করছে। ইলন মাস্ক ২০২২ সালে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছিলেন, “কম জন্মহারজনিত জনসংখ্যা পতন সভ্যতার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও বড় হুমকি।”প্রোন্যাটালিজম এতটাই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে যে তারা নতুন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন-“টেকনো-পিউরিটানিজম”।প্রোন্যাটালিজম এতটাই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে যে তারা নতুন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন-“টেকনো-পিউরিটানিজম”।
তাদের অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন-যারা তাদের ফাউন্ডেশনকে উইলে উপকারভোগী হিসেবে রাখবে, তাদের সম্পূর্ণ জিনোম সংরক্ষণ করা হবে ভবিষ্যতে মানব বা এআই পরিবেশে তা ব্যবহার করার জন্য। ম্যালকম বিশ্বাস করেন তারা ও সিমোন একরকম প্রযুক্তিগত “আদম ও হাওয়া” হয়ে উঠতে পারেন। তিনি বলেন, “যদি আমরা আট সন্তান নেই এবং আমাদের প্রজন্মগত সংস্কৃতি তৈরি করি তাহলে মাত্র ১১ প্রজন্ম পরে আমাদের বংশধরের সংখ্যা বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে।”
প্রোন্যাটালিজম এতটাই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে যে তারা নতুন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন-“টেকনো-পিউরিটানিজম”।প্রোন্যাটালিজম এতটাই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে যে তারা নতুন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন-“টেকনো-পিউরিটানিজম”।


