বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যেমন আমাদের জীবনে নানা সুফল নিয়ে এসেছে, তেমনি কিছু অন্ধকার দিকও উন্মোচন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ম্যানোস্পেয়ার’ নামে পরিচিত এক অনলাইন পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠী। শুরুতে এটি কিছু হতাশ পুরুষের অনলাইন গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ, সংঘবদ্ধ ডিজিটাল নেটওয়ার্কে, যার প্রভাব বাস্তব জীবনের রাজনীতি, সম্পর্ক এবং নারীদের নিরাপত্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই গোষ্ঠী নারীবিদ্বেষ, পুরুষতান্ত্রিকতা ও ঘৃণাকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার বীজ বপন করছে।
ম্যানোস্পেয়ার কী?
‘ম্যানোস্পেয়ার’ শব্দটি মূলত অনলাইনে একধরনের পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠী ও তাদের চক্র বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন উপগোষ্ঠী রয়েছে, যেমন ইনসেল (Involuntary Celibates), যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মানসিকভাবে হতাশ; MGTOW (Men Going Their Own Way), যারা নারীদের পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিজেদের পথে যাওয়ার পক্ষে; পিক-আপ আর্টিস্ট (PUA), যারা নারীদের ‘জিততে’ বিভিন্ন কৌশল শেখায়; এবং ‘রেড পিল’ আন্দোলন, যারা নারীদের জন্মগতভাবে পুরুষ শোষণকারী বলে মনে করে।
কেন উদ্বেগের কারণ?
এই গোষ্ঠীর বক্তব্য নারীদের প্রতি একঘেয়ে অবজ্ঞা, সন্দেহ ও ঘৃণা ছড়ায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা সমস্যার জন্য তারা নারীদের দায়ী করে। বিশ্বজুড়ে ‘ম্যানোস্পেয়ার’-এর প্রভাব থেকে অনেক সহিংস ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে হতাশ কিছু পুরুষ নারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই ধরনের ভাবধারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অ্যালগরিদমের কারণে যারা একবার এই বিষয় নিয়ে দেখেন, তাদের কাছে আরো ঘৃণাসূচক কনটেন্ট বেশি করে পৌঁছায়।
তরুণ পুরুষদের মধ্যে সামাজিক একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ব্যর্থতা অনেক বড় কারণ। যখন তারা নিজেরাই সমস্যার মুখোমুখি হন, তখন ‘ম্যানোস্পেয়ার’ তাদের জন্য এক ধরণের সহজ ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই গোষ্ঠী বলে তোমার সমস্যার জন্য নারীরা দায়ী। এভাবে তারা নিজের হতাশা অন্যের ওপর দোষারোপ করে মানসিক স্বস্তি খোঁজে।
সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা এতোটাই প্রস্তুত নয় যে তারা তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা ও সহায়তা এখনও যথেষ্ট নয়। ফলে তারা অনলাইনে এই ধরনের ক্ষতিকর গোষ্ঠীতে প্রবেশ করে এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুব্ধ অনুভব করে।
এই সংকট থেকে উত্তরণ করতে হবে অনেক স্তরে। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরিবারগুলোকে পুরুষ ও নারীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সমতা শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণাসূচক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসার দরকার যাতে পুরুষরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত হয়। সবশেষে, ‘ভালো পুরুষ’ বা প্রকৃত পুরুষত্বের একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা জরুরি, যেখানে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও সম্মান মিশ্রিত থাকবে।
ম্যানোস্পেয়ার’ কেবল একটি অনলাইন সমস্যা নয়, এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের পরিচায়ক। এটি সমাজের জন্য এক বড় হুমকি, কারণ এটি নারীবিদ্বেষ, হিংসা এবং বিভাজনের জন্ম দেয়। আমরা যদি সময়মতো সতর্ক না হই, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ আরও অস্থিতিশীল হবে। তাই দরকার সকল স্তরের সচেতনতা ও যৌথ প্রয়াস, যাতে আমরা একটি সংহত, মানবিক ও সমতার সমাজ গড়ে তুলতে পারি।


