মোদির চীন সফরকে কেন ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন ভারতের রাজনীতিকেরা?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক চীন সফর দেশীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সফরটিকে তিয়ানজিনে চীনের কাছে “ভারতীয় হাতির আত্মসমর্পণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ সোমবার ‘এক্স’ হ্যান্ডলে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বঘোষিত ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মতো তিয়ানজিনে পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, চীনের দ্বিমুখী নীতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিষয়গুলোতে মোদি কোনো দৃঢ় অবস্থান নেননি। এসসিও সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং মোদিকে বলেছিলেন যে ভারত এবং চীন দুই দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার, যা ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিপরীত।

সদৃশ সমালোচনায় সরব হয়েছে হায়দরাবাদের এআইএমআইএম। দলের নেতা ও লোকসভা সদস্য আসাউদ্দিন ওয়েইসি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী মোদি নির্বাক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের যুগলবন্দী এবং চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে মোদি কোনো অবস্থান গ্রহণ করেননি। এছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতি এমন যে এখনও ভারতীয় সেনারা লাদাখের বাফার জোনে নিরাপদভাবে টহল দিতে পারছেন না।

জয়রাম রমেশ আরও বলেন, মোদি ২০২০ সালের ১৯ জুন গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনকে ক্লিন চিট দিয়ে দেশের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এবার তিয়ানজিন সফরেও তার পদক্ষেপ দেশ ও জনগণের স্বার্থে উপযুক্ত ছিল না। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি কোনো শক্তিশালী বা কার্যকরী পদক্ষেপ নেননি। চীনা পণ্যের অবাধ আমদানি ভারতের মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রভাব ফেলতে পারে, যা কংগ্রেসের গভীর উদ্বেগের বিষয়।

ওয়েইসি তার সমালোচনায় উল্লেখ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর জলবণ্টন, সীমান্তে নিরাপত্তা, বিরল খনিজ পদার্থ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি বিষয়ে চীনের সঙ্গে কোনো অগ্রগতি হয়নি। মোদি–সি বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে এবং ভারতের স্বার্থকে সংরক্ষণে কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ দেখা যায়নি।এছাড়া ছবি তোলা, জ্যাকেটের রঙ বা কার্পেটের দৈর্ঘ্য নিয়ে মোদি–সি বৈঠকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভারতীয় জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন।

তিয়ানজিন সফরের আগে কংগ্রেস স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, তারা আশা করেছিল পূর্ব লাদাখে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা, চীনা পণ্যের ভারতীয় বাজারে প্রভাব, সীমান্ত নিরাপত্তা, নদী ও জলবণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকরী আলোচনা হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ফল দেখা যায়নি। জয়রাম রমেশ প্রশ্ন তুলেছেন, চীনের দাপট এবং ভারতের নতিস্বীকার কি এই নতুন স্বাভাবিকতা হিসেবে ধরা হবে?

বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানও ভারতের চীনের প্রতি নির্ভরতার উদ্বেগকে প্রমাণ করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্য হয়েছে ১১৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীনের পণ্য আমদানি করেছে ১০,৯০০ কোটি ডলারের সমতুল্য, আর ভারতের চীনে রপ্তানি মাত্র ৯৮০ কোটি ডলারের। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৯,৯২০ কোটি ডলার। বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছেন, এই ঘাটতি আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষ করে টেলিকম, ইলেকট্রনিকস ও শক্তি ক্ষেত্রে চীনের ওপর ভারতের নির্ভরতা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বাজারে চীনা পণ্যের প্রাধান্য বেড়ে যেতে পারে, যা চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে শক্তিশালী করবে।

মোদির চীন সফর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে। কংগ্রেস এবং এআইএমআইএম দুই দলই মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী এই সফরে দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং ভারতের স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন