মোদির ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ , ভারতকে আরও বিপদে ফেলবে : অপূর্বানন্দ , দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

“১২ মে, অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার দুই দিন পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, …‘অপারেশন সিঁদুর’কে এখন থেকে ভারতের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী নীতি হিসেবে দেখা হবে। তিনি এটিকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে এক নতুন মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেন।

মোদির ভাষণ শান্তির বার্তা দেওয়ার জন্য নয়, বরং এটি ছিল এটাই জানানোর জন্য যে–ভারত এখন স্থায়ীভাবে একরকম যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।

এই নতুন অবস্থা ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, বরং মোদির জাতীয়তাবাদী ভোটারদের খুশি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কারণ, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় হতাশ হয়েছিলেন।

পেহেলগামের সন্ত্রাসী হামলায় বেঁচে যাওয়া হিমাংশি নারওয়াল (যিনি তাঁর স্বামী নৌবাহিনীর কর্মকর্তা বিনয় নারওয়ালকে হারিয়েছেন) যখন শান্তির আহ্বান জানান এবং মুসলিম ও কাশ্মীরিদের নিশানা না বানাতে বলেন; তখন বিজেপিকে উল্টো পথে হেঁটে প্রতিশোধের ডাক দিতে ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।

… ঘৃণামূলক বক্তব্যের পরপরই তার বাস্তব প্রভাব দেখা যায়। ভারতের নানা জায়গায় মুসলিম ও কাশ্মীরিদের ওপর হামলা হয়।…পাকিস্তানে হামলার সময় ভারতীয় গণমাধ্যমে একধরনের উন্মাদনা শুরু হয়। অনেকে পাকিস্তানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার আহ্বান জানায়।

… এ সময় যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করছিলেন, তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারত সরকার টুইটার (বর্তমানে এক্স) প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় আট হাজার অ্যাকাউন্ট ব্লক করতে বলে। এর মধ্যে ছিল বিবিসি উর্দু, আউটলুক ইন্ডিয়া, মাকতুব মিডিয়া, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অনুরাধা ভাসিন এবং রাজনৈতিক কনটেন্ট নির্মাতা অর্পিত শর্মার অ্যাকাউন্ট।

… এরপর বিজেপির কিছু অনলাইন সমর্থক ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিস্রির ওপর চড়াও হন, কারণ তিনি ভারতের পক্ষে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘কাপুরুষ’ বলে গালি দেওয়া হয়।…অবাক করার মতো বিষয় হলো, হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

… এখন যেহেতু প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ শেষ হয়নি, তার মানে দেশের মানুষের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আনুগত্য চাওয়া হবে। বিরোধী দলগুলো আর সরকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলার সাহস করবে না।

মুসলিমদের ওপর চাপ পড়বে এটি প্রমাণ করার জন্য যে তাঁরা দেশভক্ত। আর অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য (যার পেছনে সরকার নিজেই দায়ী) দোষ চাপিয়ে দেওয়া হবে যুদ্ধের ওপর। এ পরিস্থিতিতে বাক্‌স্বাধীনতা থাকবে ঠিকই, কিন্তু সেটা শুধু বিজেপির পক্ষে যাঁরা কথা বলবেন, তাঁদের জন্য।

ফলে বলা যায়, ভারতের গণতন্ত্র এখন যেন একধরনের ‘অসাড় অবস্থায়’ আছে। কারণ, দেশকে এখন বলা হচ্ছে—তোমার সামনে এক ‘চিরস্থায়ী শত্রু’ আছে এবং সেই শত্রুর বিরুদ্ধে একটা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ চলছে। “


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন