যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বর্ধিত শুল্ক এড়াতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের প্রকৃত উৎস গোপন করে দক্ষিণ কোরিয়ার নামে রপ্তানির চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাস্টমস এজেন্সি (Korea Customs Service – KCS) জানায়, এ ধরনের রপ্তানি জালিয়াতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৯৭ শতাংশ পণ্যের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। আজ সোমবার কেসিএস জানায়, ট্রাম্পের শুল্কনীতি কার্যকর হওয়ার আগেই তারা জালিয়াতি রোধে প্রস্তুতি নেয়, কারণ তার প্রথম মেয়াদেও এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কেসিএসের ইনভেস্টিগেশন প্ল্যানিং ডিরেক্টর লি কুয়াং উ বলেন, “এবার আমরা আগেভাগেই সতর্ক ছিলাম, তাই বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমরা আগের বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি জালিয়াতি সনাক্ত করেছি।”
২০২৪ সালে এ ধরনের অনিয়মের পরিমাণ ছিল ২.৪ কোটি ডলার, যার মধ্যে ৬২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী চালান। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেই অনিয়মের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেশি। বেশিরভাগ রপ্তানি চীনা প্রতিষ্ঠানের, যারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘রূপকৌশলিক বাইপাস’ হিসেবে ব্যবহার করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের অপপ্রয়াসের অন্যতম কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এখন পর্যন্ত কঠোর শুল্কনীতির আওতায় পড়েনি। অথচ ট্রাম্প চলতি মাসেই দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা আপাতত তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। আজ কোরীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার নাম ব্যবহার করে বিদেশি কোম্পানিগুলো শুল্ক ও প্রযুক্তিনিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা করছে। কেসিএস জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে চীনের প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ওন মূল্যের ব্যাটারির ক্যাথোড উপকরণ দক্ষিণ কোরিয়ার উৎস বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। মার্চ মাসে ১৯.৩ বিলিয়ন ওনের নজরদারি ক্যামেরার যন্ত্রাংশ চীন থেকে এনে দক্ষিণ কোরিয়ায় সংযোজন করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির চেষ্টা হয়। এসব পণ্যের বেশ কিছু ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে, আর কিছু এখনো বন্দরে আটকে রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কাস্টমস বিভাগ বেআইনি রপ্তানি ঠেকাতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং দেশের বৈধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। যারা এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য প্রসিকিউটরের দপ্তরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে শুধু দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, চীনের রপ্তানি ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনামও। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যানয় সরকার চীনা পণ্য ট্রানজিট করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ওপর কঠোর নজরদারি চালাবে এবং সংবেদনশীল রপ্তানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য চীন যদি অন্য দেশের নাম ব্যবহার করে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


