মেগিদোর যুদ্ধ আর এক তরুণ ফারাও, যেভাবে মিশরকে পরাশক্তিতে রূপ দিয়েছিল

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে সংঘটিত মেগিদোর যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না, এটি ছিল কৌশলগত বিচক্ষণতা, দুঃসাহসিক নেতৃত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিশরীয় আধিপত্য বিস্তারের এক নতুন দিগন্ত। এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তরুণ ফারাও তৃতীয় থুতমোস, যিনি রানী Hatshepsut এর মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং মিশরের বিরুদ্ধে দানা বাঁধা বিদ্রোহের মুখে পড়েন।

রানী Hatshepsut এর দীর্ঘ ২২ বছরের শাসনের পর তার ক্ষমতা থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এবং তৃতীয় থুতমোসের এককভাবে সিংহাসন দখলকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখে লেভান্টের (আধুনিক সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল, প্যালেস্টাইন ও জর্ডান অঞ্চল) কানানীয় নগর-রাষ্ট্রগুলো বিদ্রোহের সূচনা করে। এই বিদ্রোহের মূল শক্তি ছিল মিতানি সাম্রাজ্য এবং কাদেশের শাসকরা।

কানানীয় জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল মিশরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি লাভ করা। এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় থুতমোসের জন্য এটি ছিল তার ক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মেগিদো শহর দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করত। একটি উপকূলের দিকে এবং অন্যটি উত্তরের কাদেশের দিকে, এগুলো বিদ্রোহীদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এটি একটি সুদৃঢ় দুর্গ ছিল এবং ফারাওয়ের জন্য তা দখল করা ছিল অপরিহার্য।

তৃতীয় থুতমোস তার সৈন্যদের নিয়ে মিশরের পূর্ব সীমান্ত Tjaru দুর্গ থেকে যাত্রা শুরু করেন। ১০ দিন ধরে তার সৈন্যরা “Way of Horus” নামক পথ ধরে প্রায় ১২৫ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে গাজায় পৌঁছায়। সেখান থেকে আরও ২৫ মাইল এগিয়ে তারা Yehem নামক স্থানে পৌঁছান। এখানে তৃতীয় থুতমোস তার সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল মেগিদো পৌঁছানোর জন্য কোন পথটি বেছে নেওয়া হবে। তিনটি বিকল্প পথ ছিল উত্তরের পথটি ছিল Zefti অঞ্চলের মধ্য দিয়ে, দক্ষিণের পথটি Taanach এর পাশ দিয়ে এবং মধ্যবর্তী Aruna গিরিপথটি ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক। ফারাওয়ের জেনারেলরা তাকে এই perilous পথটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন, কারণ এটি ছিল মাত্র ৩০ ফুট চওড়া এবং দুই পাশে খাড়া পাহাড় থাকায় শত্রুদের অ্যামবুশের জন্য আদর্শ ছিল।

তবে তৃতীয় থুতমোস তার শত্রুদের কাছে কোনোভাবেই দুর্বলতা প্রকাশ করতে চাননি। তার “Annals of Thutmose III” গ্রন্থে উল্লিখিত আছে, তিনি দেবতা আমুন-রের নামে শপথ করে বলেন “আমার Majesty এই Aruna পথ দিয়েই যাত্রা করবে!” তিনি নিজেই তার সেনাবাহিনীর অগ্রভাগে থেকে এই বাঁকা গিরিপথ দিয়ে মার্চ শুরু করেন। শত্রুরা মিশরীয়দের এই দুঃসাহসিক কাজ করবে তা অনুমান করতে পারেনি এবং তারা কেবল অন্য দুটি পথে প্রহরী মোতায়েন করেছিল। এই কৌশলগত ভুলের কারণে তৃতীয় থুতমোসের বাহিনী কোনো বাধা ছাড়াই Aruna গিরিপথ পার হয়ে Qina উপত্যকায় পৌঁছে শত্রুদেরকে সম্পূর্ণ হতবাক করে দেয়।

পরের দিন ভোরবেলা তৃতীয় থুতমোসের সেনারা তিনটি বিশাল ইউনিটে বিভক্ত হয়ে মেগিদোর দক্ষিণে শত্রুদের encampment এর দিকে অগ্রসর হয়।তাদের আক্রমণ ছিল একটি অর্ধ-চন্দ্রাকৃতির বিন্যাসে ফলে শত্রুরা দুই পাশ থেকে ঘেরাও হয়ে পড়ে। তৃতীয় থুতমোস তার সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে স্বয়ং সেনাবাহিনীর কেন্দ্রে অবস্থান নেন। মিশরীয়দের এই সুসংগঠিত এবং আকস্মিক আক্রমণে শত্রুদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তারা তাদের শিবির ছেড়ে মেগিদো শহরের দিকে পালিয়ে যায়। এই সময়ে মিশরীয় সেনারা শত্রুদের শিবির লুণ্ঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে, শত্রুপক্ষের অনেক নেতা শহরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। প্রাচীন মিশরীয় chronicles এই ঘটনাটি Bitterly উল্লেখ করে বলেছে যে, যদি মিশরীয় সৈন্যরা plunder এর বদলে fleeing troops দের অনুসরণ করত, তাহলে বিজয় আরও দ্রুত ও চূড়ান্ত হতো।

শহরকে সরাসরি আক্রমণের মাধ্যমে জয় করা অসম্ভব জেনে তৃতীয় থুতমোস অবরোধের সিদ্ধান্ত নেন। তার নির্দেশে চারপাশের এলাকার গাছ কেটে কাঠ দিয়ে দুর্গ তৈরি করে শহরটিকে ঘিরে ফেলা হয়। ফারাও মেগিদোর কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “Every prince of every land is shut up within it, the capture of Megiddo is the capture of a thousand cities!” দীর্ঘ সাত মাস অবরোধের এর পর অবশেষে মেগিদো আত্মসমর্পণ করে। যদিও কানানীয় জোটের প্রধান কাদেশের শাসক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলে মেগিদোর শাসক সহ অন্যান্য নেতারা বন্দী হন।

মেগিদোর যুদ্ধ মিশরীয়দের জন্য বিপুল পরিমাণ লুঠ নিয়ে আসে। লেখা সুত্র অনুযায়ী, তারা ২০৪১টি ঘোড়া, ৯২৪টি রথ, ২০০টি বর্ম এবং ৫০২টি composite bows সহ অসংখ্য মূল্যবান জিনিসপত্র জব্দ করে। এই বিজয় শুধু সামরিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও ছিল ব্যাপক। এই বিজয়ের মাধ্যমে তৃতীয় থুতমোস তার আজকের ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণকে একত্রিত করেন। তার এই অত্যাশ্চর্য বিজয় এর খবর পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজতন্ত্র গুলোকে Thebes, the capital of Egypt এ দূত পাঠাতে বাধ্য করে, যারা ফারাওয়ের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য দুর্দান্ত সব উপহার নিয়ে আসে।

মেগিদোর বিজয় ছিল তৃতীয় থুতমোসের পরবর্তী সামরিক অভিযানের ভিত্তি। তার শাসনকালে তিনি আরও ১৬টি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেন, যা মিশরকে মেসোপটেমিয়ার গভীরে তার প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করে। তিনি Ullaza এবং Simyra এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট সিটি দখল করেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য ছিল। এর ফলে মিশরীয়রা তাদের বিজিত অঞ্চলে সহজে মিলিটারি এবং সাপ্লাই পাঠাতে পারত। এছাড়া তিনি সরাসরি মিটানিয়ান অঞ্চল এ আক্রমণ করেন এটি মিশরীয় শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করে।

মেগিদোর যুদ্ধ “Annals of Thutmose III” এ বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত, এটি ইতিহাসের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে নথিভুক্ত যুদ্ধ গুলোর মধ্যে একটি। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে তৃতীয় থুতমোস ছিলেন এক অসাধারণ সামরিক নেতা, যার সাহসিকতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী মিশরকে এক নতুন আঞ্চলিক মহানুভবতার যুগে নিয়ে গিয়েছিল। এই জয় কেবল মিশরীয় টেরিটরির সম্প্রসারণ করেনি, বরং এটি মিশরীয় কল্পনায় একটি পৌরাণিক অবস্থা লাভ করে পরবর্তীতে নানা বীরত্বপূর্ণ গল্পের জন্ম দিয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন