এক অন্ধকার ঘরে, বিচ্ছিন্ন এক সিম্ফনি – ঝনঝনানি, গুনগুন, আর কাঁপুনি – দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বের অর্কেস্ট্রা সুর মিলিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো সঙ্গীতজ্ঞ নেই। তবে ভালো করে দেখলে আপনি একজন ‘পারফর্মার’-এর ক্ষুদ্র এক টুকরো দেখতে পাবেন। যদিও তার কোনো স্পন্দন নেই। ঘরের কেন্দ্রে একটি উঁচু চৌবাচ্চার চারপাশে দর্শকরা ভিড় করে আছে, চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে, যেন তারা এই রহস্যময় সঙ্গীতের পিছনে কার মাথা কাজ করছে সেটা দেখতে চায়। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে দুটি সাদা ফোঁটা বসে আছে, যেন জেলিফিশের জোড়া। এ দু’টোই মিলেই গড়ে উঠেছে প্রয়াত মার্কিন সুরকার আলভিন লুসিয়ারের ‘মিনি-মস্তিষ্ক’ – যা এখনো বাস্তব সময়ে এক পোস্টহিউমাস সঙ্গীত রচনা করে চলেছে।
আলভিন লুসিয়ার ছিলেন পরীক্ষামূলক সঙ্গীতের পথিকৃৎ। তিনি ২০২১ সালে মারা যান। তবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার আর্ট গ্যালারিতে, এই সর্বাধুনিক নিউরোসায়েন্সের মাধ্যমে তাকে যেন পুনর্জন্ম দেওয়া হয়েছে। ‘যখন আপনি নিচের সেই চৌবাচ্চার ভেতরে তাকান, তখন আপনি এক ধরনের সীমা অতিক্রম করছেন,’ বলেন নাথান থম্পসন, এই প্রকল্পের একজন শিল্পী ও নির্মাতা, যার নাম Revivification। ‘আপনি এক অতল গহ্বরের দিকে তাকাচ্ছেন এবং এমন কিছু দেখছেন যা জীবিত – তবে আপনার মতো করে নয়।’
Revivification হলো এক দল বিজ্ঞানী ও শিল্পীর কাজ, যারা নিজেদের বলেন ‘চার-মাথাওয়ালা দানব’। দলের সদস্যরা হলেন শিল্পী নাথান থম্পসন, গাই বেন-আরি ও ম্যাট গিনগোল্ড এবং নিউরোসায়েন্টিস্ট স্টুয়ার্ট হজেটস। তারা গত কয়েক দশক ধরে বায়োলজিক্যাল আর্টের সীমানা টানছেন। আলভিন লুসিয়ার ছিলেন তাদের আদর্শ সহযোগী। ১৯৬৫ সালে, তিনি তাঁর বিখ্যাত কাজ Music for Solo Performer-এ প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সরাসরি শব্দ তৈরি করেন। লুসিয়ারের ভক্ত হয়ে, Revivification টিম ২০১৮ সাল থেকেই তাঁর সাথে আইডিয়া নিয়ে কথা বলা শুরু করে। তবে ২০২০ সাল পর্যন্ত, যখন লুসিয়ার ৮৯ বছরে পা দেন এবং পারকিনসন রোগে ভুগছিলেন, তখন তিনি তাঁর রক্ত এই প্রকল্পের জন্য দান করতে রাজি হন।
প্রথমে তাঁর শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) স্টেম সেলে রূপান্তর করা হয়। তারপর হজেটসের নেতৃত্বে সেই স্টেম সেলগুলো থেকে তৈরি করা হয় cerebral organoids – অর্থাৎ মস্তিষ্কের নিউরন ক্লাস্টার, যা মানব মস্তিষ্কের নকল রূপ তৈরি করে। মহামারির সময়, টিমটি প্রতি দুই সপ্তাহে একবার জুমের মাধ্যমে লুসিয়ারের সাথে দেখা করত, যতক্ষণ না ২০২১ সালে তিনি মারা যান। তখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তিনি ফিসফিস করে কথা বলতেন, কখনও সহকারীর মাধ্যমে মেসেজ পাঠাতেন, তবে তাঁর দিকনির্দেশনা কখনোই থেমে থাকত না। ‘আমরা যেন কোন শিল্প বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, আর তিনিই ছিলেন আমাদের অধ্যাপক,’ বলেন থম্পসন।
বেন-আরিও যোগ করেন- ‘তবে এটা পুরোপুরি সহযোগিতামূলক ছিল। আমরা বায়োলজিক্যাল আর্টসে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলাম… আর লুসিয়ারের কাছে এটা ছিল একদম সাই-ফাই কল্পনার মতো।’ শুরুতে আলোচনা চলাকালীন লুসিয়ার এমন সব ধারণা দিয়েছিলেন – যেমন শব্দতরঙ্গ চাঁদে পাঠানো! তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ও টিম একটি এমন পারফরম্যান্সের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা মস্তিষ্কের সংকেত, ধ্বনি ও স্থান নিয়ে তাঁর আজীবন গবেষণাকে সম্মান জানায়। এই ইনস্টলেশনের ভেতর ২০টি বিশালাকার প্যারাবলিক ব্রাস প্লেট দেয়াল থেকে বাঁকা হয়ে বেরিয়ে এসেছে, ঠিক যেন সোনালী স্যাটেলাইট ডিস্ক। প্রতিটি প্লেটের পেছনে একটি ট্রান্সডিউসার (স্পীকারের মতো) এবং একটি হাতুড়ি বসানো আছে। এগুলো মিনি-ব্রেইনের নিউরাল সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় আওয়াজ তৈরি করে, যেন এক নিঃশ্বাসবিহীন, বিচ্ছিন্ন সাউন্ডস্কেপ ঘরের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে।
Revivification টিম কাস্টম প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই কাজটিকে জীবন্ত করেছে। লুসিয়ারের organoid (মস্তিষ্কের নকল অংশ) একটি ৬৪ ইলেকট্রোডের সূক্ষ্ম জালে বসানো হয়েছে, যা জার্মান বায়োইঞ্জিনিয়ারের সাথে মিলে তৈরি করা হয়েছিল। এই ইলেকট্রোডের মাধ্যমে নিউরাল সংকেতগুলি বিভিন্ন স্তর থেকে সংগ্রহ করা যায়, অনেকটা একটি বিকাশমান মস্তিষ্কের মতো। এরপর গিনগোল্ড একটি ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে এই নিউরাল অ্যাক্টিভিটিকে ধ্বনিতে অনুবাদ করেছেন, যাতে এই কৃত্রিম মস্তিষ্ক একটি লাইভ সংগীতশিল্পীতে রূপ নেয়।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, লুসিয়ারের organoid কেবল শব্দ তৈরি করে না, বরং শব্দ গ্রহণও করে। গ্যালারিতে বসানো মাইক্রোফোন আশপাশের পরিবেশের আওয়াজ, মানুষের কথা, এবং প্লেটগুলোর অনুরণন সংগ্রহ করে এবং এই অডিও তথ্য বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে মস্তিষ্কে পাঠানো হয়। ‘আমরা খুবই আগ্রহী এটা জানার জন্য, যে ভবিষ্যতে এই organoid কি নতুন কিছু শিখবে বা পরিবর্তিত হবে কিনা,’ বলেন বেন-আরি। এই প্রকল্প জীববিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বত্বাধিকারের নতুন প্রশ্ন তোলে। তবে, Revivification টিম বলছে, এটা আগে শিল্প, তারপর বিজ্ঞান।
‘সৃষ্টিশীলতা আসলে কোথায় জন্ম নেয়?’ ভাবেন থম্পসন। ‘আমরা সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে এই বড় প্রশ্নগুলির প্রতি আগ্রহী। কিন্তু আমাদের কাজ উত্তর দেওয়া নয়, বরং আলোচনা তৈরি করা… সৃষ্টিশীলতা কি মানুষের শরীরের বাইরে থাকতে পারে? আর তা কি নৈতিক?’ টিমের আশা, তারা যে বিশাল নিউরাল ডেটা সংগ্রহ করেছে, তা ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহায়ক হবে। ‘আমরা যখন এইরকম বিশাল শিল্প-ভিত্তিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করি, তখন সম্ভাবনার সীমানা ঠেলে দিই,’ বলেন গিনগোল্ড। ‘কারণ বিজ্ঞান এখনো এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করাও শুরু করেনি।’
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, টিম চায় Revivification প্রকল্পটি সত্যিকারের অর্থে বেঁচে থাকুক – সৃষ্টিশীলভাবেও। বেন-আরি বলেন, তাঁর স্বপ্ন হলো লুসিয়ারের এই প্রতিস্থাপিত সংগীতজ্ঞ ‘নতুন স্মৃতি, নতুন গল্প’ রচনা করুক চিরকাল। এমনকি তাঁরা ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকা বা মহাকাশেও এই সিস্টেম পাঠানোর স্বপ্ন দেখছেন। এখনও পর্যন্ত, পার্থ শহরের সেই অন্ধকার ঘরে, লুসিয়ারের প্রতিভা অদৃশ্য সুরের মাধ্যমে জীবিত, যেখানে তাঁর মস্তিষ্ক চলতে থাকছে, তাঁর দেহ ছাড়াই। ‘যখন আমি লুসিয়ারের মেয়ে অ্যামান্ডাকে এই প্রকল্প সম্পর্কে বলি, সে হেসে ফেলেছিল,’ বলেন বেন-আরি। ‘… বলেছিল, এ তো পুরোপুরি আমার বাবার মতো। মৃত্যুর আগেই সে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যেন সে চিরকাল বাজাতে পারে। সে কখনো থামতে চায় না। বাজিয়েই যেতে চায়।’


