বাজেট ২০২৫–২৬ : মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ছায়ায়

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেটের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন এই বাজেট শুধু একটি অর্থবছরের আর্থিক দিকনির্দেশনা নয়, তা হতে চলেছে একটি সংকট-সংকেতময় সময়ের প্রতিক্রিয়াশীল রূপরেখা।

গত আড়াই বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা কমলেও তা এখনো নিম্ন আয়ের মানুষজনের জন্য স্বস্তিকর মাত্রায় আসেনি। মজুরি বাড়েনি সেই হারে, ফলে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সাথে ব্যয়ের বৈষম্যে পড়েছেন। এমন বাস্তবতায় বাজেটে অগ্রাধিকার পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষার পরিসর বাড়ানোর প্রশ্ন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পটভূমি ছিল কর্মসংস্থান সংকট। সরকারি খাতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৫-৬ শতাংশ। অপরদিকে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ গত এক দশক ধরে স্থবির, যার পরিণতিতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিও স্থবির হয়ে আছে। জাতীয় আয়ের (GDP) তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ যেখানে মাত্র ২৪ শতাংশ, সেখানে কাঙ্ক্ষিত হার ৩০ শতাংশের ওপরে হওয়া দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর-জিডিপি অনুপাত, যা বর্তমানে ৮ শতাংশের নিচে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকার একদিকে যেমন ব্যয় সংকোচনে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থায়নও নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে বাজেট বরাদ্দে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশের ব্যাংক স্প্রেড (ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান) ৬ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়িক খরচে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। যার পরিণতিতে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন, বা আকার ছোট করছেন। এ অবস্থায় বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

নীতির অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক উত্তাপও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে ইতিবাচক বার্তা দিলেই হবে না, বরং দরকার নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন। বিদেশি বিনিয়োগ নীতিমালায় নানা সুবিধা থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের বাস্তবতা এসব সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে অর্থনীতির সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়। স্বল্পমেয়াদে বাজেটের মাধ্যমে উৎপাদন খাতে ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার বিস্তারকে গুরুত্ব দিতে হবে। মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, বিনিয়োগ সহজীকরণ ও নীতি-প্রয়োগে দক্ষতা। আর দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাজেট কি আস্থা ফেরাতে পারবে?

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, অব্যাহত আন্দোলন এবং সড়কপথে বিঘ্ন এসবই দেশের সার্বিক পরিবেশে আতঙ্ক তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষমাণ অবস্থানে, সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। এমন বাস্তবতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয় এটি হতে চলেছে দেশের ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা ও আস্থার একটি পরীক্ষাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন