মিরর নিউরন, বিবর্তন ও সহানুভূতির বিজ্ঞান

একবার ভাবুন, আপনি হঠাৎ কারো হাই তুলতে দেখলেন আর সঙ্গে সঙ্গে আপনারও হাই উঠলো। কখনো খেয়াল করেছেন, কাউকে কাঁদতে দেখলে আপনার বুকটাও ভারী হয়ে আসে? আবার হয়তো কাউকে খুশিতে নাচতে দেখে আপনার শরীরেও একটা নাচার ভাব চলে আসে। কেন এমন হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার মস্তিষ্কের এক আশ্চর্য জিনিসে, সেটির নাম মিরর নিউরন।

‘মিরর’ মানে আয়না। আর ‘নিউরন’ হলো মস্তিষ্কের কোষ, যেগুলো দিয়ে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণ পরিচালিত হয়। এখন কল্পনা করুন, মস্তিষ্কে এমন কিছু নিউরন আছে, যেগুলো তখনই সক্রিয় হয় যখন আপনি কোনো কাজ করছেন অথবা অন্য কাউকে সেই কাজ করতে দেখছেন। ধরুন আপনি দেখলেন কেউ চোখে পানি নিয়ে কাঁদছে। আপনি নিজে কাঁদছেন না, তবুও আপনার মনের ভেতর একটা আবেগ জাগে। এই আবেগ, এই অনুভব করা’র পেছনে কাজ করছে সেই মিরর নিউরন।

কীভাবে এই নিউরন আবিষ্কার হলো?

এই নিউরনের রহস্য প্রথম আবিষ্কার হয় ১৯৯০-এর দশকে ইতালির এক গবেষণাগারে। সেখানকার বিজ্ঞানী জ্যাকোমো রিজোলাত্তি (Giacomo Rizzolatti) ও তাঁর দল এক বাঁদরের ওপর গবেষণা করছিলেন। বাঁদরটি যখন একটি কলা ধরল, তখন তার মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে (Premotor cortex) নিউরন সক্রিয় হয়ে উঠল। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, বাঁদরটি যখন অন্য কাউকে সেই কলা ধরতে দেখল, তখনও একই নিউরন সক্রিয় হলো!

এতদিন নিউরন মানেই ছিল নিজের কাজে সক্রিয় হওয়া কোষ। কিন্তু এখন দেখা গেল, অন্যের কাজ দেখেও নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে যেন নিজের কাজই করছে! এই নিউরনকেই বলা হলো “Mirror Neurons”।

মানুষের মস্তিষ্কে এই মিরর নিউরনগুলো প্রধানত দেখা যায় তিনটি অংশে, Premotor cortex —এ, চলাফেরার পরিকল্পনায় কাজ করে। Inferior frontal gyrus (Broca’s area) ভাষা ও আবেগ বোঝায় সহায়ক। Inferior parietal lobule শরীরের অঙ্গের অনুকরণ ও স্থানজ্ঞান পরিচালনায় যুক্ত। এই অঞ্চলগুলো মিলে তৈরি করে Mirror Neuron System (MNS), যা মানুষের শেখা, অনুভব ও সংবেদনশীল আচরণ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

যখন আমরা কাউকে আঘাত পেতে দেখি, কিংবা কষ্ট পেতে দেখি, তখন আমরা সেই কষ্ট অনুভব করতে পারি। এটাকে বলে Empathy বা সহানুভূতি। এই সহানুভূতির জৈব ভিত্তি হল মিরর নিউরন। এর কারণেই আমরা অন্যের চোখ দিয়ে অনুভব করতে শিখি।

আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ছোট শিশুরা বড়দের মুখভঙ্গি, হাঁটা, হাসি সবকিছু অনুকরণ করে শেখে। কারণ তারা নিজের কাজ করার আগে অন্যকে দেখে দেখে শিখে নিচ্ছে। মিরর নিউরন তাদের শেখায়, “দেখো আর করো।”

গবেষকরা মনে করেন, ভাষা শেখার আগেও আমরা মুখের ভঙ্গি দেখে শেখা শুরু করি। শিশুরা শব্দ উচ্চারণ শেখার আগেই ঠোঁট কেমন নড়ে, চোয়াল কেমন চলে তা অনুকরণ করতে শেখে মিরর নিউরনের সাহায্যে।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, Autism Spectrum Disorder (ASD) থাকা অনেক শিশুর মধ্যে এই মিরর নিউরন সিস্টেমের কাজ কম হয়। তাই তারা অন্যের অনুভূতি বুঝতে, চোখে চোখ রাখতে বা অনুকরণ করতে সমস্যায় পড়ে। যদিও এটি এখনো সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়, তবু এটি এক শক্তিশালী থিওরি।

আজকাল অনেক থেরাপিস্ট মিরর নিউরন ধারণা ব্যবহার করছেন, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত রোগী আয়নায় নিজের অঙ্গ দেখে অনুকরণ করে নড়াচড়া শেখেন। Role-modeling therapy-তে শিশুকে আচরণ শেখাতে সামনে কেউ করে দেখায়। Empathy training-এ সহানুভূতির দক্ষতা বাড়াতে নাটক বা মাইমের মাধ্যমে অন্যের অবস্থান অনুধাবনের চর্চা

সমালোচনা কী বলছে?

এ নিয়ে সব গবেষক কিন্তু একমত নন। কেউ কেউ বলেন, “মিরর নিউরনের কাজকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আবেগ ও সমাজবোধ শুধু এই নিউরনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।” আবার কেউ বলেন, “এটা শুরু মাত্র। আমরা এখনো এর পুরোটাই বুঝতে পারিনি।” তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মিরর নিউরন মানবিক আচরণ বোঝার একটা দরজা খুলে দিয়েছে।

আমরা আসলে একে অপরকে কেবল দেখি না, অনুভবও করি। আমরা শুধু ব্যক্তি নই, আমরাই সামাজিক সত্তা। একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনকে স্পর্শ করে। এটা কেবল আবেগ নয়, নিউরোসায়েন্স। আর সেই বিজ্ঞান বলে, আপনি যখন অন্যকে অনুভব করেন, তখন আপনার মস্তিষ্কও সেই কাজ করছে। এ যেন এক অদৃশ্য আয়না। যেখানে আমি, আপনি, আমরা সবাই একে অপরের প্রতিবিম্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন