ভাঙারি ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকে সোহাগকে কুপিয়ে ও শরীর-মস্তক পাথরে থেঁতলে দিয়েই পাষণ্ড দুর্বৃত্তরা ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাঁর লাশের ওপর নৃত্য করতেও দ্বিধা করেনি। এই দৃশ্য দেশবাসীকে ঝাঁকুনি দিয়েছে–মানুষ এত বর্বর ও নিষ্ঠুর হয় কী করে!
সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, আশপাশের লোকজন হতবিহ্বলে সোহাগ হত্যা প্রত্যক্ষ করলেও এগিয়ে আসেননি। নির্বিকার ছিলেন হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যরাও। আমরা কেমন সমাজে বাস করছি, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন না?
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির যুব সংগঠন যুবদলের স্থানীয় নেতা-কর্মী জড়িত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্ররোচনায় অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এই পুরান ঢাকায়ই বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচি বন্ধ করতে বিশ্বজিৎ দাস নামের এক দরজিকেও কুপিয়ে হত্যা করেছিল ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা। এরপর তাদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ।
কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো তার প্রমাণ। গত শুক্রবার খুলনার দৌলতপুরে যুবদল থেকে বহিষ্কৃত নেতাকে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, চার মাসে রাজধানীতেই খুন হয়েছেন ১৩৬ জন। সারা দেশে এই সংখ্যা ১২ শতাধিক। অন্যদিকে ২০২১ সালের প্রথম চার মাসে ঢাকায় এই সংখ্যা ছিল ৫৫, ২০২২ সালে ৫৪, ২০২৩ সালে ৫১ ও ২০২৪ সালে ৪৭।
সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করাকেই সরকারের সাফল্য বলে দাবি করেছেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হত্যার বিচার করার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁদের আশ্বাস ও অঙ্গীকার কেন অপরাধ কমাতে পারছে না?
যে সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় এ রকম খুনি তৈরি হয়, সেই সংগঠন কি খুনের দায় এড়াতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলো তাদের যেসব নেতা-কর্মী হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তাঁদের বহিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ করছে। কিন্তু কীভাবে দলের আশ্রয়ে তাঁরা দুর্ধর্ষ অপরাধীতে পরিণত হচ্ছেন, সেই প্রশ্ন নিজেদের করছেন না।
দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের দায় দল নেবে না—বিএনপির নেতারা আগে এ কথা বলে এলেও একশ্রেণির নেতা-কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যার কারণে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও নিন্দা-প্রতিবাদ বাড়ছে। এর আগে ৩ জুলাই আসামি ছিনিয়ে নিতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় হামলা চালান বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
একশ্রেণির নেতা-কর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত দলের বড় একটি অংশ রাতারাতি টাকা বানানোর ধান্দায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে অনেকে উৎসাহী। তাই যার যেখানে প্রভাব আছে, সে সেখানে অবৈধ অর্থের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
এ জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ—এমন কর্মকাণ্ড চলছে। যেখানেই এসব কাজে বাধা আসছে, সেখানেই অঘটন ঘটছে এবং ঘটনাক্রমে কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে।
একের পর এক নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মমাফিক কার্যক্রমের বাইরে কিছু করছে না। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নিয়োজিত আছেন।
অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও পক্ষপাতমূলক। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আসামি ছিনতাই করার দায়ে সরকার স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু চট্টগ্রামের পটিয়ায় যাঁরা পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হলেন, সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
অপরাধীদের দমন করতে হলে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায় এড়ানোর মনোবৃত্তি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।


