অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া বিশ্বসাহিত্যের এক চিরন্তন ও বহুমাত্রিক থিম। এটি কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, মানুষের মানসিক, দার্শনিক এবং সামাজিক সংকটের গভীর প্রতীক। প্রাচীন মহাকাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক উপন্যাসের জটিল কাঠামো পর্যন্ত, ‘ঘুমহীন রাত’ বারবার লেখক ও পাঠকের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের যাদুবাস্তববাদী উপন্যাসে এটি যেমন ‘প্লেগ’ হয়ে এসেছে, তেমনই আধুনিক লেখকদের কাছে তা হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা বা নিছক অস্তিত্বের শূন্যতা।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কালজয়ী উপন্যাস ‘One Hundred Years of Solitude’-এ অনিদ্রা এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা লাভ করে। মাকোন্দো গ্রামে যে “নিদ্রাহীনতার মহামারী” দেখা দেয়, তা কোনো সাধারণ রোগ নয়, এক যাদুবাস্তববাদী অভিশাপ। এর চরিত্ররা প্রথমে ঘুম না আসায় খুশি হয়; তারা মনে করে, এখন তাদের হাতে কাজ করার জন্য আরও বেশি সময় থাকবে। কিন্তু শীঘ্রই তারা আবিষ্কার করে, ঘুম না আসাটা মূল সমস্যা নয়।
উপন্যাসে ভারতীয় রমণী ভিজিটাসিওন বুয়েন্দিয়া পরিবারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অনিদ্রার অনিবার্য পরিণতি হলো স্মৃতিশক্তির বিলোপ। চরিত্ররা রাত জাগতে অভ্যস্ত হয়ে যখন স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়, তখন তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অতীত, পরিচিতি, এমনকি নিত্যব্যবহার্য জিনিসের নাম পর্যন্ত ভুলে যেতে শুরু করে। হোসে আরকাডিও বুয়েন্দিয়া তখন প্রতিটি বস্তুকে লেবেল করে, যেমন—’টেবিল’, ‘চেয়ার’, ‘গরু’—কিন্তু তারা জানে একদিন তারা অক্ষরগুলোও ভুলে যাবে। মার্কেজ এখানে অনিদ্রার মাধ্যমে কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ার গভীর আতঙ্ককে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনিদ্রা এখানে এক জাতীয় ট্র্যাজেডির রূপক, যা একটি পুরো সভ্যতাকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বিশ শতকের আধুনিকতাবাদী লেখকদের কাছে অনিদ্রা একটি ব্যক্তিগত ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে উঠে এসেছে, যা মানসিকতাকে দিনের আলোর বাস্তবতা থেকে রাতের আঁধারের গভীরে নিয়ে যায়।
ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্ত দীর্ঘকাল ধরে অনিদ্রায় ভুগেছিলেন। তার সুবিশাল উপন্যাস ”In Search of Lost Time’ শুরুই হয় ঘুমানোর এবং রাতে জেগে ওঠার বর্ণনা দিয়ে। প্রুস্তের কাছে ঘুম ও জাগরণের মাঝের সেই ‘সন্ধিক্ষণ’ বা ‘Hypnagogic state’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় যখন চেতনা সম্পূর্ণভাবে জাগ্রত থাকে না, তখন ‘অনিচ্ছাকৃত স্মৃতি’ জেগে ওঠে, যা জীবনের সারসত্যকে উন্মোচিত করে। অনিদ্রা প্রুস্তের জন্য ছিল এক সময়ের ভেতরের সময়, যা মনকে গভীরতম আত্ম-অনুসন্ধানে ডুব দিতে সাহায্য করে। ঘুমের অভাব তার শিল্পকর্মের কাঠামোরই একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
রুশ-আমেরিকান লেখক ভ্লাদিমির নাবোকভ ছিলেন আরেকজন ক্রনিক ইনসমনিয়াক। তিনি ঘুমকে ‘সময় নষ্ট’ বা ‘উত্পাদনশীলতার পথে বাধা’ মনে করতেন, যা তার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে থামিয়ে দেয়। নাবোকভের কাছে অনিদ্রা ছিল এক ধরণের মানসিক শৌর্য বা তীব্র সৃজনশীলতার ফল। তাঁর উপন্যাস ‘লোলিতা’-তে হামবার্ট হামবার্টের অনিদ্রা তার চারিত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব বর্ণনা তৈরির একটি মোটিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা দেখায় কীভাবে জাগ্রত চেতনা দিয়ে সে নিজের অসৎ কাজকে যৌক্তিকতা দেয়। তিনি এমনকি স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে যে স্বপ্ন ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা হতে পারে, যেখানে সময় হয়তো বিপরীত দিকেও প্রবাহিত হয়।
উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে অনিদ্রা প্রায়শই আধুনিক জীবনের উদ্বেগ, বিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের কঠোর কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির ছোটগল্প ‘ঘুম’-এর প্রধান চরিত্র একজন মধ্যবিত্ত গৃহিণী, যিনি হঠাৎ করেই টানা সতেরো দিন ঘুমহীন কাটান। আশ্চর্যজনকভাবে এই অনিদ্রা তাকে ক্লান্ত করার পরিবর্তে এক ধরণের বিপ্লবী মুক্তি এনে দেয়। দিনের বেলায় তিনি বাধ্যগতভাবে সংসার সামলান, কিন্তু রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, তখন তিনি নিঃশব্দে ওয়াইন পান করেন, চকোলেট খান এবং আন্না কারেনিনা পড়েন। এই গোপন রাত জাগা তার চাপা পড়া আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতার প্রতীক। অনিদ্রা তাকে অভ্যস্ত জীবন থেকে ‘জাগ্রত’ হওয়ার সুযোগ দেয়। মুরাকামি দেখান যে কীভাবে আধুনিক শহুরে জীবনে, যেখানে সবাই নিজেদের কাজে মগ্ন, সেখানে একজন মানুষ টানা সতেরো দিন না ঘুমালেও কেউ খেয়াল করে না। এই অনিদ্রা তার গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের শূন্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
সাহিত্য কেবল সৃজনশীলতার ক্ষেত্র হিসেবে অনিদ্রাকে দেখেনি, এটিকে গভীর মানসিক যন্ত্রণা, অপরাধবোধ এবং অস্তিত্বের অর্থহীনতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করেছে। কাফকা ছিলেন একজন ইনসমনিয়াক এবং তাঁর লেখায় অনিদ্রা প্রায়শই এক অসহনীয় উদ্বেগ এবং মানসিক পীড়নের ফল হিসেবে আসে। কাফকা মনে করতেন, তাঁর লেখালেখিই তাঁর ঘুম কেড়ে নেয়, কারণ এটি তাঁর মনকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল করে তোলে। তাঁর কাছে রাত জাগা মানে দৃশ্যমান জগতের প্রতিরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিজের ভেতরের ‘অন্ধকার’-এর কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া।
ফিওদর দস্তয়ভস্কির উপন্যাসগুলিতে অনিদ্রা চরিত্রের অপরাধবোধ ও নৈতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাসকোলনিকভ হত্যার পর দীর্ঘ অনিদ্রায় ভোগে। এই ঘুমহীন রাতগুলো তার অপরাধের স্বীকারোক্তি বা মনস্তাত্ত্বিক বিচারের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলা সাহিত্যেও অনিদ্রা একাধিকবার এসেছে নানা অর্থে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা “ঘুম” ও “নিশীথে” ঘুমহীন রাতকে রূপ দিয়েছে আত্মসংলাপের সময়ে। জীবনানন্দ দাশের “রাতের কুকুর” বা “আট বছর আগের একদিন”-এর মতো কবিতায় নিদ্রাহীনতা একাকীত্বের প্রতিধ্বনি।
বিশ্বসাহিত্যে অনিদ্রা তাই ঘুম ব্যাধি নয় এটি এক শক্তির উৎস এবং একইসাথে বেদনার চিহ্ন। এটি মানুষের মনকে অপ্রতিরোধ্য কল্পনা, গভীরতম আত্ম-বিবেচনা বা অনিবার্য ধ্বংসের দিকে চালিত করে। ঘুমহীন রাত কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং তা মানব অস্তিত্বের গভীরতম সত্যের সন্ধান।


