মার্কিন শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষি – চীনের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ কমানোর চাপ, কি করবে বাংলাদেশ?

বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে একমত হলেও বাণিজ্যের বাইরের বিষয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্ক বিষয়ক দর-কষাকষি আটকে আছে।এর মধ্যে এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে যেগুলোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যদের পরামর্শ নিয়ে আগামী সপ্তাহে তৃতীয় দফায় দর-কষাকষির আলোচনা করতে ওয়াশিংটনে যাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের (গোপনীয়তার চুক্তি) কারণে দর-কষাকষি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছেন না সরকারের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী নেতা প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।ভূরাজনৈতিক কৌশলগত বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যার মূল উদ্দেশ্য–বাংলাদেশ যাতে চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না যায়।যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে মনোযোগী হবে না। এমনকি চীনা বিনিয়োগেও বেশি উৎসাহ দেবে না বাংলাদেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দর-কষাকষিতে যেসব শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে–যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশকে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তা মেনে চলতে হবে। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা বিনিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্যকে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, তা অন্য কোনো দেশকে না দেওয়ার শর্ত রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন–যুক্তরাষ্ট্র চায়, সামরিক কাজে ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী দেশটি থেকে আমদানি করুক বাংলাদেশ। তার বিপরীতে চীন থেকে সামরিক পণ্য আমদানি কমানোর নিশ্চয়তা চায় দেশটি।

ঢাকা যাতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কৌশলের (আইপিএস) পক্ষে থাকে সেটিও চায় যুক্তরাষ্ট্র। আইপিএস হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিস্তৃত কৌশল। এর লক্ষ্য হচ্ছে পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮৬৯ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ শতাংশের কিছু বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক।

বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ হার বিদ্যমান হারের অতিরিক্ত। এতে মোট শুল্ক দাঁড়াবে অন্তত ৫১%।

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। রপ্তানিকারকরা বলছেন, নতুন শুল্কহার কার্যকর হলে ভারতের কাছে এ মর্যাদা হারানোর শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশকে টপকে তৃতীয় স্থানে চলে আসতে পারে ভারত। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, ভিয়েতনাম এবং ভারতের শুল্কভার ২০ শতাংশের মধ্যেই থাকছে। চুক্তির ফলে চীনের পণ্যের শুল্ক ৯০ শতাংশ কমছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি এখন অসম প্রতিযোগিতার মুখে। দেশটিতে রপ্তানি ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে বাংলাদেশের।

তবে, রপ্তানির বাজার কিছু দেশের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ অনুসারে, ভিয়েতনামের জিডিপির প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রপ্তানি থেকে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি জিডিপির অনুপাত ছিল ১২.৫%।

বাংলাদেশের জিডিপি বা অর্থনীতি রপ্তানি দিয়ে চলে না; বরং আমাদের আমদানি বেশি। অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের চেয়ে সেবা খাতের অবদান বেশি। যদিও রপ্তানি কমে গেলে অর্থনীতি ধাক্কা খাবে, তা নিশ্চিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় প্রসঙ্গে ফেসবুকে আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক নাজমুল আহসান লিখেছেন —

‘যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেট আর রপ্তানি ভিয়েতনামের জন্য মহা গুরুত্বপূর্ণ। নট সো মাচ ফর বাংলাদেশ। আমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইইউর মার্কেট। এই কারণে ভিয়েতনাম ডেসপারেট হয়েছে। বাংলাদেশেরও হতেই হবে, তা নয়।

ইয়েস, ৩৫% ইজ অ্যা সেটব্যাক। কিন্তু তাই বলে সবকিছু গ্লুম আর ডুম নয়। ইন ফ্যাক্ট, বাংলাদেশের যেই মেইন প্রোডাক্ট অর্থাৎ রেডিমেড গার্মেন্টস, এটা সরাসরি আমেরিকার ভোক্তা পর্যায়ে অ্যাফেক্ট করবে। বাংলাদেশ বরং ধীরে চলো নীতিতেও খারাপ করবে না।’

শিক্ষক ও বিশ্লেষক শিবলী আজাদ লিখেছেন — ‘মালয়েশিয়ান বাণিজ্যমন্ত্রী শুল্ক কমাতে ট্রাম্পের চুক্তির শর্তকে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হাত দেয়া আখ্যা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে–আমেরিকার সাথে মালয়েশিয়ার ট্রেড ডিল হলে হবে, নইলে কুয়্যালালমপুর নিজের পথ দেখবে। বাংলাদেশকে হয়ত, মালয়েশিয়ার পথে হাঁটতে হবে।

আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীনের সাথে বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলার। চীন থেকে বাংলাদেশ কৃষি ও শিল্পের মেশিনারী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, গার্মেন্টের জন্যে তুলা ও খাদ্যশস্য আমদানী করে। বাংলাদেশের ভেতর আমদানীকৃত পণ্যের দাম কম রাখতে বাংলাদেশ চীনা পণ্যের ওপর কম ট্যারিফ বা শুল্ক রাখে। তা না হলে, ২০ হাজার টাকার যন্ত্র ৬০ হাজার টাকা দাম হতো—চীনকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্প সেটাই চাচ্ছে। সেটা করতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। কৃষিপণ্যের দাম হবে আকাশচুম্বী।

দরকারে, আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানী ৩-৪ বিলিয়ন ডলার কমে গেলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক তথা জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে বাংলাদেশের উচিৎ হবে না ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। ঢাকার সাফ জবাব হবে, দিলে দাও না হলে ৩৫% সই।

মনে রাখতে হবে ট্রাম্পের আগ্রাসী এই নীতিও হবে সাময়িক। সারা দুনিয়ার সাথে গোলযোগ বাঁধানোর কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে ক্রাইসিস দেখা দিলেই ট্রাম্প ফের নড়েচড়ে বসবে। সেটাও না হলে, বড়জোর আর সাড়ে তিন বছর ট্রাম্পের শুল্কনীতি বলবৎ থাকবে। ট্রাম্পের বিদায়ের পরই আমেরিকা ফের আগের নীতিতে ফিরে যাবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন