১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনীকে পরাজিত করে পুরো দেশের ক্ষমতা কব্জা করেছিল।স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির কিংবদন্তি নেতা হো চি মিনের নামে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন শহরটির নাম বদলে রাখা হয় হো চি মিন সিটি।যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোর ৫০ বছর উদযাপনে হো চি মিন শহরে আয়োজিত কুচকাওয়াজে শাসকদল কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান প্রধান তো লাম বলেন — “এটা ছিল বিশ্বাসের বিজয়, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বিজয়।” ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেষ যোদ্ধাদলকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল ২০ বছরব্যাপী লম্বা যুদ্ধের, যা ৩০ লাখ ভিয়েতনামি ও প্রায় ৬০ হাজার মার্কিনির প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
সায়গনের দিকে উত্তর ভিয়েতনামের ট্যাঙ্কগুলোর অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হেলিকপ্টারগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার লোককে দেশটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মার্কিন দূতাবাসের ছাদ থেকে সর্বশেষ হেলিকপ্টারটি উড়াল দেয় ৩০ এপ্রিল সকাল ৭টা ৫৩ মিনিটে, নিয়ে যায় সায়গনে থাকা শেষ মার্কিন মেরিন যোদ্ধাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভিয়েতনাম একীভূত হয় আরও এক বছর পরে, যার মাধ্যমে অবসান ঘটে ২২ বছর আগে ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর দুই টুকরা হয়ে পড়া ভিয়েতনামিদের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের। ভিয়েতনামের গ্রামীণ এলাকায় এখনও আগের যুদ্ধের সময় ব্যবহার হওয়া অ্যাজেন্ট অরেঞ্জ বিষাক্ত রাসায়নিক এবং অবিস্ফোরিত বিস্ফোরকের উপস্থিতি মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে আছে।
ভিয়েতনামিদের কাছে যুদ্ধে হেরেছিল ফরাসীরাও। গত বছর দিয়েন বিয়েন ফু-র যুদ্ধের সমাপ্তির ৭০ বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে ফ্রান্স তাদের এক মন্ত্রীকে পাঠিয়েছিল। ওই যুদ্ধের মাধ্যমে ভিয়েতনামে ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। সায়গন থেকে মার্কিন সেনাদের পাততাড়ি গুটানোর ২০ বছর পর ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ২০২৩ সালে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সফরের সময় থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।৫০ বছর পূর্তিতে বুধবারের কুচকাওয়াজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতে ওয়াশিংটন হো চি মিন সিটিতে তাদের কনসাল জেনারেলকে পাঠিয়েছে। দশ বছর আগে, যুদ্ধজয়ের ৪০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি ছিল না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এক সময়ের চরম শত্রু থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কালের পরিক্রমায় ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার গ্রহণ করেছে পুঁজিবাদ। এ ক্ষেত্রে তারা অনুসরণ করেছে প্রতিবেশী চীনকে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে ভিয়েতনাম হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক পণ্য উৎপাদনকেন্দ্র। ক্ষেত্র বিশেষে, ভিয়েতনাম এখন চীনের বিকল্পও। মার্কিনিদের সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামের তরুণরা কী ভাবছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ভিয়েতনামের আইন শিক্ষার্থী মিনের ভাষ্য, ‘আমরা তাদের ঘৃণা করি না। যা ঘটেছে তা অতীত। এখন আমরা আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চাই। আমরা তাদের কাছ থেকে শিখতে চাই।’ হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্স্থাপন করলেও রাশিয়ার সঙ্গে এখনও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। মস্কো এখনও ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী।
একাধিক সংঘাত এমনকি এখনও দক্ষিণ চীন সাগরের অনেক অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও উত্তরের প্রতিবেশী চীনের সঙ্গেও ভিয়েতনামের সম্পর্ক বেশ ভালো।ভিয়েতনামের অর্থনীতিতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে; বেইজিং হ্যানয়কে এমন অনেক উপকরণ সরবরাহ করে যেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিন লাখের বেশি চীনা সৈনিক অংশ নিয়েছিলেন। তারা বিমান প্রতিরক্ষায়, রসদ সরবরাহে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সাহায্য করেছিলেন। বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে হ্যানয়।


