মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা ও জিনতত্ত্ব এমন দুটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি সভ্যতার ধারাকে আমূল রূপান্তর করেছে। ইদানীংকালে যে আবিষ্কারটি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তা হলো CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি। এটি একটি জিন সম্পাদনার পদ্ধতি যা জীবন্ত কোষের ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট ও নিখুঁত পরিবর্তন সাধনে সক্ষম।
CRISPR শব্দটির পূর্ণরূপ হলো Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিদ্যমান। এই ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা, পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
২০১২ সালে Jennifer Doudna এবং Emmanuelle Charpentier প্রথম মানব কোষে CRISPR-Cas9 প্রয়োগযোগ্য করে তোলেন। এই প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো তার নির্ভুলতা, দ্রুততা এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচ। এর ফলে জিনগত রোগের চিকিৎসা থেকে শুরু করে কৃষি ও প্রাণিবিজ্ঞান পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
মানুষের জিনোমে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ জিন রয়েছে, যেগুলো আমাদের শারীরিক গঠন, রোগপ্রবণতা ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। জিনতত্ত্বগত ত্রুটির কারণে বহু গুরুতর রোগ— যেমন থ্যালাসেমিয়া, সিকল সেল অ্যানিমিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হান্টিংটন ডিজিজ ইত্যাদি— দেখা দেয়। CRISPR এই ত্রুটিপূর্ণ অংশকে কাটিয়ে সেখানে সঠিক সিকোয়েন্স বসাতে সক্ষম।
ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে, যেখানে জিন সম্পাদনার মাধ্যমে এইসব রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ২০২০ সালে চীনের বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনা করে যমজ শিশুর জন্ম দেন, যারা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত ছিল। যদিও এই গবেষণাটি নৈতিকতার প্রশ্নে ব্যাপক সমালোচিত হয় এবং বিজ্ঞানীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।
CRISPR প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন ও বিতর্কিত ধারণার জন্ম হয়েছে— “Designer Baby”। এর অর্থ জন্মের পূর্বেই সন্তানের শারীরিক গঠন, বুদ্ধিমত্তা, আচরণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করা। এই প্রযুক্তি একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ হলেও, অন্যদিকে এটি সমাজে বৈষম্য, শ্রেণিভিত্তিক বংশগঠন এবং জিনগত শ্রেষ্ঠতাবাদের জন্ম দিতে পারে।
এর ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, জিন সম্পাদনার সীমা কোথায়? কবে এটি চিকিৎসার প্রয়োজনে থেমে যাবে এবং কবে তা শোভনতার ধারণায় প্রবেশ করবে? যদি ধনী পরিবারগুলো উচ্চতর আইকিউ, সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন সম্পন্ন সন্তান নির্বাচন করতে সক্ষম হয়, তবে সমাজে একটি নতুন ধরণের জৈবিক বৈষম্য তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক চলমান।
নৈতিক বিতর্ক প্রবল হলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে CRISPR প্রযুক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। Somatic Cell Editing এর মাধ্যমে শুধুমাত্র ব্যক্তির শরীরের কোষে পরিবর্তন আনা হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় না। এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন— সিকল সেল অ্যানিমিয়া ও ক্যান্সারের নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
যেসব রোগ পূর্বে কেবল নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, সেগুলোর জন্য এখন স্থায়ী নিরাময়ের পথ খুলছে। হিমোগ্লোবিন সংক্রান্ত জিনে পরিবর্তন এনে থ্যালাসেমিয়ার নিরাময় সম্ভব হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় অগ্রগতি ।
CRISPR প্রযুক্তি যেহেতু ভবিষ্যতের মানবজীবন ও সমাজকে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তাই আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। জাতিসংঘ, UNESCO, WHO ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু নীতিমালা তৈরি করেছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে আইন ও গবেষণা নীতিমালা তৈরি করাও জরুরি, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য, যাতে এ প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় এবং অপব্যবহার রোধ করা যায়।
CRISPR প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন উঠেছে— মানুষ কি এখন নিজের প্রকৃতি পুনর্গঠনের ক্ষমতা অর্জন করেছে? যদি মানব জিন সম্পাদনা করে ভবিষ্যতের মানুষকে গঠন করা হয়, তবে “প্রাকৃতিক” ও “নির্মিত” মানুষের মধ্যে ব্যবধান কোথায়? এই প্রশ্ন শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজতত্ত্ব, নৈতিকতা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
CRISPR প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এটি চিকিৎসা, কৃষি, প্রাণিবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে এর ব্যবহারে যে নৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক সংকট দেখা দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই।


