মানুষ কেন পাশে শুয়ে থাকা বধুটি আর শিশুটিকে ফেলে এক গাছি দড়ি হাতে জীবনের ইতি টানতে যায় ! মার্ক্স অন সুইসাইড

আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, যা মনস্তাত্ত্বিক নৈতিক এবং সামাজিক কারণে ঘটতে পারে। তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ বা বিপর্যয়ের ফলস্বরূপ নয় বরং সমাজের কাঠামোগত সমস্যা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ফলও হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কার্ল মার্কসের “পুখে অন সুইসাইড” প্রবন্ধটি সমাজতাত্ত্বিকভাবে আত্মহত্যার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে। মার্কস মূলত পুঁজিবাদী সমাজের সমালোচক হয়ে আত্মহত্যাকে কেবলমাত্র এক ব্যক্তির দুর্দশার ফল হিসেবে না দেখে এটিকে পুঁজিবাদী সমাজের শ্রেণীভেদ, শোষণ এবং বৈষম্যের কারণে তৈরি হওয়া একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

জ্যাক পুখে ছিলেন ফরাসি পুলিশের একজন প্রশাসক। তিনি তার পুলিশ জীবনের আত্মহত্যা কেস থেকে তুলে আনা লেখায় আত্মহত্যাকে মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আত্মহত্যার কারণে হিসেবে নানা ধরনের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সমস্যাকে দেখেছেন, যেমন- দুঃখ, অবসাদ, অপমান, আর্থিক সমস্যা বা জৈবিক সম্পর্কের অস্থিরতা। পুখের লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণ করা। তাঁর মতে মানুষ যখন আত্মহত্যা করে তখন তার মূল কারণ অন্তর্নিহিত মেন্টাল সিচুয়েশন, যেটি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তিনি আত্মহত্যাকে ব্যক্তি বিশেষের নৈতিক এবং মানসিক ব্যর্থতা হিসেবেই দেখেন। কিন্তু আত্মহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের বা রাষ্ট্রের কোনো দায়ভার অনুভব করেননি। তাঁর লেখায় আত্মহত্যাকে মূলত একটি পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সামাজিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভাবিত হলেও তাদের গভীর বিশ্লেষণ বা সমালোচনা তেমন দেখা যায়নি।

কিন্তু মার্কস “পুখে অন সুইসাইড”- এ পুখের বিশ্লেষণকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত দুঃখ বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে না দেখিয়ে এটি সমাজের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকরা শোষিত এবং বিচ্ছিন্ন। এই শোষণ এবং বিচ্ছিন্নতা মানুষকে এক গভীর অর্থহীনতার অনুভূতি দেয়। যা অনেক সময় ভিক্টিমদের আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নগর জীবনে সকাল বিকাল বাসা ভাড়া আর দুইবেলা খেয়ে বাঁচার জন্য প্রতিদিন অফিস বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করা -মানুষটা এক রাতে জীবনের প্রবল অন্তসারশূন্যতা অনুভব করে জীবনানন্দের “আট বছর আগের একদিন” কবিতার মতো পাশে শুয়ে থাকা বধূটি আর শিশুটিকে ফেলে এক গাছি দড়ি হাতে অশ্বত্থের গাছে ঝুলে পড়তে যায়।

তাই মাক্স মূলত আত্মহত্যাকে পুঁজিবাদী সমাজের একটি ফলস্বরূপই দেখেন, যেখানে শ্রমিকরা নিজের শ্রমের ফল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং এত স্ট্রাগলের পরও সমাজে তাদের কোনো স্থান বা মূল্য থাকে না। এই সমাজে মানুষের পরিচয় নির্ধারণ হয় শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে। ফলে শ্রমিকদের মানবিকতা এবং মর্যাদা লুপ্ত হয়ে যায় এবং তারা শুধুমাত্র এক ধরনের যন্ত্রে পরিণত হয়। এ বিচ্ছিন্নতা এবং হতাশা মানুষের মধ্যে এক ধরনের অক্ষমতা সৃষ্টি করে, যা আত্মহত্যার মতো বিপর্যয়ের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘকাল ধরে পুঁজিবাদের ভিক্টিম হতে থাকা কিছু কিছু মানুষও ধীরে ধীরে নিজেরাই একেকজন ফ্যাসিস্ট হয়ে চারপাশের মানুষের মধ্যে নিজেকে জাহির করতে গিয়ে অন্য ভোক্তভুগীদের সুইসাইডের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করে।

মার্কসের দৃষ্টিকোণ অনুসারে পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষকে শুধুমাত্র উপকরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে এবং এতে মানুষের সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কগুলো বিপর্যন্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো দুঃখজনকভাবে ভেঙে পড়ে এবং আত্মহত্যার প্রেরণা বৃদ্ধি পায়। শ্রমিক জীবনের শোষণ, কর্মের প্রতি উদাসীনতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও চারপাশের নিচু ভঙ্গি তাকে এক অন্ধকার যাত্রায় নিয়ে যায় যেখানে আত্মহত্যাই একমাত্র উপায় মনে হতে পারে। মার্কসের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নিউ মডার্ন সোসাইটিতেও প্রাসঙ্গিক, যেখানে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষের মধ্যে হতাশা, অবসাদ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি করছে। মার্কসের বিশ্লেষণ আমাদের শেখায় আত্মহত্যার সমস্যা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অবস্থা নয়। এটি সমাজের একটি বৃহত্তর সংকট, যা সমাজের কাঠামো, অর্থনীতি এবং শ্রেণী সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত।

সমাজের পারস্পরিক শোষণভঙ্গি, শ্রেণীভেদ এবং অর্থনৈতিক শোষণ দূর না হলে আত্মহত্যার সমস্যা কখনই সমাধান হবে না। “পুখে অন সুইসাইড” প্রবন্ধে মার্কস পুখের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছেন। এই দৃষ্টিকোণটি আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় আত্মহত্যার মূল কারণ শুধুমাত্র ব্যক্তির মানসিক অবস্থা নয়, একটি বৃহত্তর সমাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, যার সমাধান ফ্যাসিস্ট কাঠামোর সংস্কারেই নিহিত।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন