মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি সম্পর্কে আমাদের মাঝে অনেক ধারণা রয়েছে। আমরা প্রায়ই মনে করি আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিগুলি যথেষ্ট সমৃদ্ধ, কিন্তু সেই চিন্তা ও অনুভূতিগুলিকে বাস্তব সময়ের মধ্যে যথাযথভাবে প্রকাশ করা আমাদের জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই এটিকে “ব্যান্ডউইথ সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই বিষয়ে এলন মাস্ক একধরণের সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। মাস্কের এক দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হল, এমন একটি ইন্টারফেস তৈরি করা যা মানুষের মস্তিষ্ককে সরাসরি কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করতে দেবে, যাতে কথা বলার বা লেখার মতো ধীর গতির মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা এই ধারণাটির একেবারে বিপরীত ফলাফল প্রকাশ করেছে।
Neuron জার্নালে প্রকাশিত নিউরোসায়েন্সে নতুন একটি গবেষণা দেখিয়েছে মানব মস্তিষ্কের গতি খুব ধীর। গবেষণাটি অনুসারে, মানুষের স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কল্পনা করার গতি প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১০ বিট। বিপরীতে মানব সংবেদনশীলতা সিস্টেমের কাজ করার গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক বিলিয়ন বিট, যা আমাদের মস্তিষ্কের কাজের গতি থেকে প্রায় ১০০,০০০,০০০ গুণ দ্রুত।গবেষকদের মতে এই বিশাল গ্যাপটি মানুষের মনে এমন একটি বিভ্রম তৈরি করে যে, আমরা একসাথে অসীম চিন্তা করতে পারি, যদিও বাস্তবে আমরা একে একে শুধুমাত্র একটি করে চিন্তা করতে সক্ষম।
এই গতি ব্যবধানটি “মাস্ক বিভ্রম” হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ, এলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তারা যেভাবে মনে করেন যে তাদের মস্তিষ্কের চিন্তা প্রচুর গতি নিয়ে কাজ করছে, তা বাস্তবতা থেকে অনেকটাই দূরে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (Caltech) নিউরোসায়েন্টিস্ট মার্কাস মেইস্টার এবং তার সহলেখক জিয়েউ ঝেং এই গবেষণার মাধ্যমে এই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।গবেষণার মতে, মস্তিষ্কের কাজের গতি অত্যন্ত ধীর এবং এটি একসময় শুধুমাত্র একটি কাজ করতে পারে। তা সে চিন্তা হোক কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ। মানুষের মস্তিষ্কের কাজের গতি প্রতি সেকেন্ডে ১০ বিটে সীমাবদ্ধ, যা একেবারেই সীমিত। সুতরাং যদি এলন মাস্ক তার মস্তিষ্ককে একটি কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করতে সক্ষম হন, তবে তিনি যা আশা করছেন, তা হবে না। তার মস্তিষ্কের গতি তেমন বেড়ে যাবে না, কারণ তার মস্তিষ্কের কাজের গতি যে ধীর, সে বিষয়টি প্রকৃতিরই একটি সীমাবদ্ধতা।
এটি দেখায় যে, আমরা যতই প্রযুক্তির উন্নতি করি না কেন আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা এক জায়গাতেই থাকবে। নতুন প্রযুক্তি বা নানাবিধ উদ্ভাবন সত্ত্বেও, মস্তিষ্কের গতি এবং কাজের সীমাবদ্ধতা একে অপরকে অতিক্রম করতে পারবে না। মানব মস্তিষ্ক কেবল একবারে একটি চিন্তা বা কাজ করতে সক্ষম এবং এই সীমাবদ্ধতা মানুষকে জটিল কাজ করার জন্য বাধাগ্রস্ত করে। মস্তিষ্কের গতি যেমন ধীর, তেমনি মানব সংবেদনশীলতা সিস্টেম-যেমন চোখ, গন্ধ, শোেনা ইত্যাদি-অনেক দ্রুত কাজ করে। এই সিস্টেমগুলি প্রতি সেকেন্ডে এক বিলিয়ন বিট তথ্য প্রক্রিয়া করে, যা আমাদের মস্তিষ্কের কাজের গতির চেয়ে অনেক বেশি। এই বৈপরীত্যের কারণে মানুষ মনে করে, তাদের চারপাশের প্রতিটি বিশদ বিবরণ তারা সম্পূর্ণ ভাবে দেখতে বা শুনতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, এটি সম্পূর্ণ সত্য নয়।আমাদের চোখের মাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য আমরা দেখতে পাই, তা একেবারেই সীমিত। আমাদের দৃষ্টি কেন্দ্রের বাইরে কী হচ্ছে, তা আমরা ঠিকভাবে দেখতে বা বুঝতে পারি না।
মেইস্টার বলেন, আমাদের চোখ যেহেতু যেকোনো বিস্তারিত ফোকাস করতে পারে, তাই আমরা ভুলভাবে মনে করি যে, আমরা সব কিছু একসাথে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের যে সীমাবদ্ধতা, তা আমাদের সত্যি সত্যি মাত্র একটি বিষয় বা চিন্তা উপলব্ধি করতে বাধা দেয়। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কেন মানুষ এক সময় একাধিক চিন্তা করতে পারে না। কেন আমাদের মস্তিষ্ক একসাথে ১০০০টি চিন্তা ধারণ করতে পারে না, যদিও প্রতি চিন্তা প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১০ বিটের গতি সম্পন্ন? এটি এক গভীর রহস্য এবং বিজ্ঞানীরা এখনো এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পাননি। তবে, এটি মানুষের মন এবং মস্তিষ্কের কাজের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এখন গবেষকদের উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্কের এই সীমাবদ্ধতা বুঝে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। তারা বিশ্বাস করেন আমাদের মস্তিষ্কের গতির সাথে আমাদের সংবেদনশীলতা সিস্টেমের গতি মিলিয়ে, বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি বের করতে পারবেন। কিন্তু তাও এটি মানব মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতাকে পুরোপুরি অতিক্রম করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। এলন মাস্কের মতো উদ্ভাবকরা যেভাবে তাদের মস্তিষ্কের কাজের গতি বৃদ্ধির আশা করেন, তা বাস্তবতা থেকে বেশ দূরে। গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে, মানব মস্তিষ্কের গতি সীমাবদ্ধ এবং এটি একসাথে একাধিক চিন্তা বা কাজ করতে অক্ষম। তবে বিজ্ঞানীরা এই সীমাবদ্ধতার ওপর গবেষণা চালিয়ে আরও অনেক কিছু শিখতে সক্ষম হতে পারেন এবং এটি প্রযুক্তি এবং মস্তিষ্ক সম্পর্কিত আমাদের ভবিষ্যৎ ধারণাকে পুনরায় পর্যালোচনা করতে সাহায্য করবে।


