বাংলাদেশে মানব পাচার একটি চলমান এবং গভীর সমস্যা, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে নারী ও তরুণরা পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। এসব ঘটনায় অনেকেই বিদেশে ভালো জীবনযাপনের আশায় বের হয়ে নানা ধরনের নির্যাতন, শোষণ এবং এমনকি মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। সালমা খাতুনের ঘটনা এ ধরনের এক দুঃখজনক উদাহরণ, যার যাত্রা ইতালির দিকে যাওয়ার লক্ষ্যে শুরু হলেও তা তার জন্য এক ভয়ানক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
সালমার গল্প ২০২১ সালে শুরু হয়, যখন তিনি জীবনে পরিবর্তনের আশায় ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কম খরচে বিদেশ যাওয়ার আশায় তিনি স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তাকে ভারতে নেয়া হয়, তারপর বিমানে করে ইতালি পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ভারতে তাকে আটকিয়ে নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। অবশেষে তিনি ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হন এবং ৬ মাস জেল খাটেন। দেশে ফিরে তিনি সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করলেও সব আসামি খালাস পেয়ে যান।
সালমার এই ঘটনা থেকেই দেশের মানব পাচার চক্রের ভয়াবহতা ও আইনি দুর্বলতা বোঝা যায়।
সময়কাল
মোট মামলা
মোট আসামি
দণ্ডপ্রাপ্ত
দণ্ডপ্রাপ্তির হার
২০১৯
জানুয়ারি ২০২৫
৪,৫৪৬
১৯,২৮০
১৫৭
০.৮১%
অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। এই দুর্বলতা সমাজে পাচারকারীদের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। একটি বড় কারণ হিসেবে পুলিশি তদন্তের দুর্বলতা রয়েছে। অনেক সময় যথাযথ সাক্ষী হাজির করা হয় না এবং প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থ হয় তদন্তকারীরা। এছাড়াও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া অনেক ভুক্তভোগীকে হতাশ করে তোলে এবং তারা মামলা চালিয়ে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানব পাচারের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে মানসম্পন্ন তদন্ত এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার চাহিদা ক্রমবর্ধমান, এটি পাচারকারীদের সুযোগ সৃষ্টি করছে। তারা এক ধরনের সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলেছে, যারা প্রতারিত করে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা প্রতারিত হয় এবং শোষণের শিকার হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকটকসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণীদের পাচার করা হচ্ছে। এছাড়া ২০২২ সালে হবিগঞ্জের সোহেল নামের এক টিকটকার তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে যান।সেখানে তার স্ত্রীকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং সোহেল পালিয়ে যান। যদিও এই ঘটনায় শ্বশুর মামলা করেছিলেন, তবে এখনও তদন্ত শেষ হয়নি।
এ ধরনের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, পাচারকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে যুবকদের নিশানা করছে। এতে পাচারকারীদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে এবং তারা নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। এছাড়া মানব পাচারের মামলায় শাস্তির হার অত্যন্ত কম হলেও অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৭২ জন বাংলাদেশি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ভূমধ্যসাগরে ডুবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আট বাংলাদেশি মারা যান।
এই সমস্যা সমাধানে বারবার সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট নয়। মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করছেন, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে এবং সরকারকে জনগণকে অবহিত করতে হবে যাতে তারা অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে। পুলিশি তদন্তের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বাংলাদেশে মানব পাচারের সমস্যা একটি জটিল ও জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আইনগত পদক্ষেপ, পুলিশি তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব। যতক্ষণ না পর্যন্ত সিস্টেমিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হয়, পাচারকারীরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাবে এবং নিরপরাধ মানুষ আরো ভুক্তভোগী হবে।


