মানবসভ্যতা কি এলিয়েনের তৈরি ?

মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে বহু গবেষণা, তত্ত্ব এবং মতবাদ রয়েছে, যার মধ্যে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক এবং কিছু অতিপ্রাকৃত বা কল্পনাশক্তির উদ্ভব। এসবের মধ্যে জেকারিয়া সিচিনের তত্ত্বটি বিশেষভাবে বিতর্কিত এবং আকর্ষণীয়। সিচিন রুশ-ইজরায়েলী লেখক এবং প্রাচীন ইতিহাসের গবেষক। তিনি তার বইগুলিতে দাবি করেছেন মানুষের সৃষ্টি ছিল একটি জেনেটিক প্রকৌশলের ফলস্বরূপ, যা সম্পন্ন হয়েছিল প্রাচীন এলিয়েনদের দ্বারা। এই তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে তিনি প্রাচীন সুমেরীয় গ্রন্থাবলী এবং শিলালিপির অনুবাদকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে এলিয়েনদের আগমন এবং মানবজাতির বিবর্তনে তাদের ভূমিকার প্রমাণ বহন করে।

সিচিনের মতে পৃথিবীতে এলিয়েনরা নিবারু নামক একটি গ্রহ থেকে এসেছিল। তারা মানুষের প্রাথমিক রূপ হোমো এরেকটাস থেকে আধুনিক মানুষ তৈরি করতে সহায়তা করেছে। এই এলিয়েনরা প্রায় ৪৫০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সোনালি খনি থেকে সোনা সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে তারা পৃথিবীতে তাদের কলোনি স্থাপন করেছিল। সিচিন দাবি করেন, এই এলিয়েনরা তাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য হোমো এরেকটাসে ঢেলে দিয়েছিল, যাতে তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয় এবং তাদের প্রয়োজনীয় সোনা খনন করতে পারে।

সিচিনের তত্ত্বের মূল ভিত্তি প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার শিলালিপি এবং চিত্রকলাগুলিতে নিহিত। সুমেরীয়রা পৃথিবীর প্রথম উন্নত সভ্যতা গঠন করেছিল এবং তাদের লিখিত ভাষায় কিছু এমন তথ্য রয়েছে, যা সিচিন দাবি করেন তা এলিয়েনদের অস্তিত্ব এবং তাদের পৃথিবীতে আগমনের প্রমাণ সরবরাহ করে। বিশেষ করে সিচিনের উল্লেখযোগ্য একটি বই “”দ্য টোয়েলফ প্ল্যানেট”” -এ তিনি নিবারু গ্রহের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে নিবারু একটি দীর্ঘ অল্লিপটিক অরবিটে ঘুরতে থাকে এবং প্রায় ৩,৬০০ বছরে একবার পৃথিবীর কাছ দিয়ে চলে আসে। সিচিনের দাবি, এই গ্রহের অধিবাসীরা প্রায় ৯ ফুট উচ্চতার ছিল এবং তারা মহাকাশযান ব্যবহার করে পৃথিবীতে এসেছিল।

সিচিনের তত্ত্বে মানব বিবর্তনের বিষয়টি একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ তার স্বাভাবিক বিবর্তন দ্বারা নয় বরং এলিয়েনদের দ্বারা জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত এবং উন্নত হয়েছে। এই এলিয়েনরা সুমেরীয় দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিল এবং তাদের শাসন ও জ্ঞান দিয়ে পৃথিবীতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের মধ্যে অনেক দেবতা যেমন এনকি, যাকে সুমেরীয়রা বিজ্ঞানের দেবতা হিসেবে পূজা করতো, তাদের কাছ থেকেই পৃথিবীতে জ্ঞান এবং প্রযুক্তি ছড়িয়েছিল।

সিচিনের মতে, এই এলিয়েনরা কেবলমাত্র মানুষের জ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতি ঘটানোর জন্যই পৃথিবীতে আসেননি, তারা সুমেরীয়দের হাতে সোনা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাচীন সভ্যতাগুলির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সুমেরীয়দের কৃষি ও চাষাবাদ সম্পর্কে যা জানা যায়, তা সিচিনের মতে এলিয়েনদেরই প্রদত্ত জ্ঞান ছিল, যেগুলো পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

সিচিনের তত্ত্বটি কিছু পাঠক ও অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, এটি প্রচুর বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিচিনের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যাকে ভুল এবং পুঁজিবাদী অভিলাষী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সিচিনের কাজ প্রাচীন সভ্যতার সত্যিকারের ইতিহাস থেকে বিচ্যুত এবং প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো। বিশেষ করে সুমেরীয় শিলালিপি এবং চিত্রকলার অনেক অনুবাদ সঠিক নয় এবং এটি সিচিনের নিজের অনুমান ও কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

প্রাচীন গ্রন্থাবলীর একটি বৃহৎ অংশ মিথ এবং প্রতীকী ভাষায় লেখা ছিল, যেগুলো সিচিনের মতো লেখকরা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, সুমেরীয়রা তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রকৃতির ঘটনাগুলিকে ব্যাখ্যা করেছে, সেগুলো সিচিন ভিন্নভাবে ধরেছেন। সিচিনের তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা কম হলেও এটি মানব ইতিহাস এবং সভ্যতার উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করেছে। তাঁর তত্ত্বটি এমন এক আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের সৃষ্টি, বিবর্তন এবং মহাকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নগুলিকে নতুনভাবে উত্থাপন করে। সম্ভবত সিচিনের মতবাদ ইতিহাসের একটি রহস্যময় অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে, যেগুলো আমাদের অতীতের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌতূহল সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন