জন্ম একসময় ছিল একান্তই প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাও আজ প্রযুক্তির ছায়ায় নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম গর্ভাশয়, ক্লোনিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স এইসব নতুন প্রযুক্তির আলোকে জন্ম এখন শুধুই শারীরবৃত্তীয় কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক, নৈতিক ও সামাজিক এক জটিল বাস্তবতা। তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ জন্মাবে কীভাবে? কে সিদ্ধান্ত নেবে জন্মের?
মা হবেন যন্ত্র?
বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই “External Womb” বা বাইরের গর্ভাশয় প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছেন। ইজরায়েলের গবেষকরা ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো কৃত্রিমভাবে ভ্রূণকে গর্ভাশয়ের বাইরে ২১ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি যদি মানুষের উপর প্রয়োগযোগ্য হয়, তবে মা হওয়া মানে আর নিজের শরীরে সন্তান ধারণ করা নয়। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।মাতৃত্ব তখন আর শুধু নারীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, সমাজে পিতৃত্ব, মাতৃত্ব ও অভিভাবকত্বের ধারণা বদলে যাবে। ধনী পরিবার বা রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মতো করে শিশু তৈরি করতে পারবে। ফলে জন্ম একটি সামাজিক শ্রেণি বিভাজনের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
জন্মের আগেই শিশুর চোখের রঙ, উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা এমনকি চারিত্রিক গঠনও নির্ধারণ করা সম্ভব, এখন এটি আর সাই-ফাই নয়।CRISPR নামক প্রযুক্তি দিয়ে মানব-ডিএনএ সম্পাদনার (gene editing) মাধ্যমে ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরি করা যাচ্ছে। এটি এখনো নৈতিকভাবে বিতর্কিত ও নিয়ন্ত্রিত হলেও কিন্তু ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও জনপ্রিয় হতে পারে।
ধনী ও প্রযুক্তিসম্পন্ন পরিবাররা সুপার-চাইল্ড তৈরি করতে পারবে, ফলে সমাজে জিনগত শ্রেণীবিন্যাস গড়ে উঠতে পারে। ডারউইনের ‘Survival of the Fittest’-এর ধারণা মুছে গিয়ে তা হয়ে উঠবে ‘Designed to be the Fittest’।
ভবিষ্যতের জন্ম মানেই শুধুমাত্র দেহগত অস্তিত্ব নয়, তথ্যগত অস্তিত্বও। আজ জন্মের সাথে সাথে শিশুর পরিচয় বায়োমেট্রিক, জিনোম সিকোয়েন্সিং, স্বাস্থ্য ডেটা ইত্যাদির মাধ্যমে ডিজিটালি সংরক্ষিত হচ্ছে। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে হবে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।রাষ্ট্র বা কর্পোরেট সংস্থা জন্মের সাথে সাথেই শিশুর সম্ভাব্য ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে পারবে। স্বাধীনতার প্রশ্ন আসলে, জন্ম কি তখন একটি ব্যক্তি অধিকার হবে, নাকি একটি প্রি-ডেটারমিনড পণ্য?
ভবিষ্যতে শুধু মানুষের শরীর থেকে নয়, কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্লোন বা এমনকি এআই সন্তানের ধারণাও বাস্তব হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই রোবট সন্তানের ধারণা এবং ভার্চুয়াল চাইল্ড অ্যাডপশন নানান দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে।
একটি শিশুর সাথে আবেগ, পরিচর্যা ও ভালোবাসা এগুলো যদি এআই সন্তানের সাথেও সম্ভব হয়, তবে মানুষ জন্ম কি শুধুই জৈবিক থাকবে? ক্লোন সন্তানের উত্তরাধিকার, পরিচয়, মানবাধিকার এসব এখনো সম্পূর্ণ অজানা এবং অনিয়ন্ত্রিত এলাকা।
যে সমাজ একসময় জন্মকে ঈশ্বর-নির্ভর বা নিয়তি-নির্ভর মনে করত, সেই সমাজ আজ জন্মকে তথ্য, অর্থ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ভবিষ্যতের জন্ম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে নতুন অর্থ দেবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্ম সীমিত বা অতি নির্ধারিত হলে প্রাকৃতিক জনসংখ্যা ঘাটতি/বৃদ্ধির ওপর প্রভাব পড়বে।
জন্ম একসময় কেবলমাত্র দেহ, আবেগ ও সম্পর্কের উৎস ছিল, তা ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে প্রোগ্রামড, ইঞ্জিনিয়ারড ও নিয়ন্ত্রিত ঘটনা। প্রশ্ন উঠছে মানুষ কি কেবল জন্ম নেবে, নাকি ভবিষ্যতে তাকে তৈরি করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিজ্ঞানের হাতে নয়, সমাজ, নৈতিকতা ও রাজনীতির হাতেও।


