সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের এক অবিসংবাদিত প্রতিভা। তার সৃষ্টিকর্মে আমাদের চিরচেনা গ্রামীণ জীবনকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত এবং গভীর দার্শনিক অর্থে সমৃদ্ধ। তাঁর অমর সৃষ্টি “চাকা” নাটকটি শুধুমাত্র একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি অস্তিত্ব, মৃত্যু এবং জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের এক অসাধারণ দলিল। এই নাটকে তিনি এক মৃত ব্যক্তির লাশকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজের সরলতা, কুসংস্কার এবং একই সঙ্গে মানুষের একাকিত্ব ও অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরেছেন।
“চাকা” নাটকের মূল গল্প শুরু হয় এক অচেনা, অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশকে কেন্দ্র করে। একটি গরিব গ্রামীণ সমাজে হঠাৎ এক মৃতদেহ আসে, কিন্তু কেউ জানে না সে কে, কোথা থেকে এসেছে। অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃতদেহ একটি গরুর গাড়িতে করে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গাড়োয়ান ও তার সঙ্গী এই মৃতদেহটি দাফন করার জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজছে। প্রশ্ন ওঠে এই লাশ কে দাফন করবে? কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না, কারণ লাশের পরিচয় নেই, সামাজিক সম্পর্ক নেই। ফলে লাশ যেন এক অচেনা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সেলিম আল দীন নাটক লিখেছেন মাটির মানুষদের নিয়ে। শহরের কৃত্রিম পরিসর নয়, তাঁর নাটকের প্রাণগ্রন্থি গ্রাম। “চাকা”-তেও আমরা দেখি, দরিদ্র কৃষক, শ্রমজীবী, মজুর, দিনমজুর মানুষেরা কীভাবে একসাথে বসবাস করে। কিন্তু লাশের উপস্থিতি সেই সাম্য ভেঙে দেয়। মানুষ আতঙ্কিত হয়, অচেনাকে ভয় পায়, আবার দায়িত্ব এড়াতে চায়।
গ্রামীণ বাস্তবতার এই চিত্র আমাদের সমাজের ভেতরের ভাঙনকে প্রকাশ করে। দরিদ্র মানুষেরা পরস্পরের পাশে দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু সংকটময় মুহূর্তে স্বার্থপরতা ও ভীতি সামনে চলে আসে। এভাবেই সেলিম আল দীন গ্রামীণ জীবনের ভেতর থেকে মানুষের অস্তিত্বসংকটকে প্রকাশ করেন।
এই পুরো নাটক লাশটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, বাস্তবে এখানে মানুষ, সমাজ, মৃত্যুচেতনা এবং অর্থহীনতার প্রশ্নই বড় হয়ে ওঠে।গ্রামীণ লোকদের মধ্যে পারস্পরিক আলাপ, দ্বন্দ্ব, গুজব এবং ভয়ের ভেতর দিয়ে নাটকটি মানুষের প্রকৃত চেহারাকে ফুটিয়ে তোলে।
নাটকে সেলিম আল দীন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় দিক তুলে ধরেছেন। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ, তাদের কথাবার্তা, কুসংস্কার, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক—সবকিছুই নাটকে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গরুর গাড়ির চাকার অবিরাম ঘূর্ণন যেন জীবনের চাকার অবিরাম চলাচলের প্রতীক। এটি গতিশীলতা, পরিবর্তন এবং জীবনের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে। গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিনতার গভীরে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা, এক তীব্র অস্তিত্বের সংকট। নাটকের চরিত্রগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ হলেও, তাদের প্রতিটি সংলাপ ও কর্মকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে জীবনের অর্থ খোঁজার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।
“চাকা” নাটকে অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল উপাদানগুলো স্পষ্ট। অস্তিত্ববাদী দর্শন অনুযায়ী, মানুষের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ বা উদ্দেশ্য নেই। মানুষ নিজেই তার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
নাটকের প্রধান চরিত্র গাড়োয়ান এবং সঙ্গীটি যেন এই দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি। তারা একটি মৃতদেহ নিয়ে যাত্রা করছে, যার কোনো পরিচয় নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই। এই যাত্রার কোনো শেষ নেই, কারণ তারা মৃতদেহ দাফনের জন্য কোনো স্থান খুঁজে পাচ্ছে না। এই নিরন্তর যাত্রা মানুষের জীবনের অর্থহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
নাটকে একাকিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ থিম। গাড়োয়ান এবং তার সঙ্গী একসঙ্গে যাত্রা করলেও তারা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের কথাবার্তা মূলত মৃতদেহকে ঘিরে, কিন্তু তারা নিজেদের জীবনের গভীর শূন্যতা নিয়ে কথা বলে না। এই নিঃসঙ্গতা আধুনিক মানুষের একাকিত্বের এক সার্বজনীন চিত্র। গাড়োয়ান যখন প্রশ্ন করে, “আমরা কি শুধু মরা মানুষ বইতে থাকব?”, তখন সে আসলে তার নিজের জীবনেরই উদ্দেশ্যহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
নাটকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৃত্যু। অস্তিত্ববাদী দর্শনে মৃত্যু জীবনের এক অনিবার্য অংশ। এটি আমাদের অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তোলার সুযোগ দেয়। “চাকা” নাটকে মৃতদেহটি শুধুমাত্র একটি বস্তু নয়, এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের এক নির্মম স্মারক । এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন ফুরিয়ে যায় এবং আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে বের করতে হবে। মৃতদেহটি যখন তার গন্তব্য খুঁজে পায় না, তখন এটি আমাদের অস্তিত্বের অর্থহীনতার এক বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরে।
সেলিম আল দীন “চাকা” নাটকে বিভিন্ন প্রতীকের ব্যবহার করেছেন যা নাটকের গভীরতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো অবিরাম ঘুরতে থাকা গরুর গাড়ির চাকা। এটি শুধু একটি যান্ত্রিক অংশ নয়, এটি জীবন, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের চক্রের প্রতীক।চাকার অবিরাম ঘূর্ণন যেন মানুষের জীবনের অবিরাম যাত্রাকে নির্দেশ করে। মৃতদেহটি আমাদের সামনে অস্তিত্বের প্রশ্নটি তুলে ধরে। পথ যখন শেষ হয় না, তখন তা জীবনের উদ্দেশ্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
নাটকের আঙ্গিকও বেশ ব্যতিক্রমী। এতে প্রচলিত কাহিনীর বাঁধন নেই, বরং এটি একটি এপিসোডিক বা খণ্ড খণ্ড ঘটনার সমষ্টি। নাটকের ঘটনাগুলো এক ধরনের অদ্ভূত আবর্তে ঘুরতে থাকে, যা অস্তিত্বের বৃত্তাকার গতিকে নির্দেশ করে। সেলিম আল দীন-এর এই পরীক্ষা নিরীক্ষা বাংলা নাটকে এক নতুন ধারা যোগ করেছে।
“চাকা” নাটকটি গ্রামীণ জীবনের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হলেও, এর মূল বার্তাটি সার্বজনীন। এটি আমাদের অস্তিত্ব, একাকিত্ব, মৃত্যু এবং জীবনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। সেলিম আল দীন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রামীণ জীবনের সরলতা এবং অস্তিত্ববাদী দর্শনের গভীরতাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। এই নাটকে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি জীবনের কঠিনতম সত্যগুলো তুলে ধরারও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
“চাকা” নাটকটি মানুষের অস্তিত্বের এক নিরন্তর অনুসন্ধান। এই নাটক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই যেন এক গরুর গাড়ির যাত্রী, একাকী এবং আমাদের নিজেদের জীবনের চাকা আমাদের নিজেদেরই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।


