মাটি ছাড়াই উৎপাদন হবে ঘাস , কাটবে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের একদল গবেষক মাটি ছাড়া চাষাবাদের মাধ্যমে গৃহপালিত পশুর খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের ঘাস উৎপাদন করেছেন। এই ঘাসকে বলা হয় ‘হাইড্রোপনিক ফডার’, যা সাধারণ ঘাসের তুলনায় অনেক বেশি পুষ্টিকর। গবেষণার ফলাফল এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর আড়াইটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, “সম্প্রতি বন্যার কারণে দেশে প্রচুর গবাদিপশু খাদ্যসংকটে পড়েছিল এবং অনেক পশু খাদ্যের অভাবে মারা গেছে। এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা গবাদিপশুর খাদ্য সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, বিদেশে বেশিরভাগ খামারি নিজেরাই গোখাদ্য উৎপাদন করেন, ফলে তাদের পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং দুধ উৎপাদনও বেশি হয়। হাইড্রোপনিক ফডার উৎপাদন বাংলাদেশের শহরাঞ্চল ও জমিহীন খামারিদের জন্য কার্যকর হতে পারে। তিনি এই গবেষণার আরও সম্প্রসারিত প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন। অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন প্রধান প্রফেসর ড. মো. শামীম আহমেদ কামাল উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গবেষণা ও উদ্ভাবনী কেন্দ্রের পরিচালক প্রফেসর ড. কাজী দিদারুল ইসলাম, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম এবং প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. সরদার শফিকুল ইসলাম।

গবেষকরা জানান, সাধারণ ঘাসের তুলনায় হাইড্রোপনিক ফডারের অনেক সুবিধা রয়েছে। এতে অধিক পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও উচ্চমাত্রার আমিষ থাকে। এটি প্রাণীদের কাছে সুস্বাদু এবং সহজে হজম হয়। মাত্র ৭ থেকে ১১ দিনের মধ্যে উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এতে আঁশ ও লিগনিনের মাত্রা কম থাকে এবং এনার্জির পরিমাণ বেশি হয়। অঙ্কুরোদ্গম প্রক্রিয়ার কারণে এনজাইমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায় যা ভিটামিন বি, সি ও এ উৎপাদনে সহায়তা করে এবং প্রাণির দেহে ভিটামিন শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি করে।

গবেষকরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আবহাওয়ায় পাঁচ প্রজাতির বীজ ব্যবহার করে ফলন, পুষ্টিগুণ ও উৎপাদন খরচ বিশ্লেষণ করেছেন। বীজগুলোর মধ্যে ছিল ভুট্টা, গম, যব, সরগাম ঘাস ও বরবটি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিকূল পরিবেশেও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফডার উৎপাদন করা সম্ভব। খরচের দিক বিবেচনায় গমের ফডার বেশি লাভজনক, তবে ফলনের দিক থেকে যব ও বরবটি অধিক সফলতা দেখিয়েছে। প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘‘হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষ করে চীনে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর তা নিয়ে আরও গবেষণা করা উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “এই প্রযুক্তি শহরাঞ্চল ও জমিহীন খামারিদের জন্য বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। গবেষণার উন্নতির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।’’ এই গবেষণা বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি পশুখাদ্যের ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে এবং বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষকদের সহায়তা করবে। কর্মশালায় উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কৃষকরা গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন