গবেষক আন্না হেনেসির মতে, আমাদের মস্তিষ্ক, আমাদের সত্তা এবং আমাদের চেতনা তৈরি করার জন্য যে জেনেটিক কোড অনুযায়ী কাজ করে তা শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, এমনটা নয়। মাইক্রোকাইমেরিজম (Microchimerism), যেখানে গর্ভাবস্থার সময় মায়ের এবং শিশুর মধ্যে কোষ বিনিময়ের মাধ্যমে অ-উত্তরাধিকারী ডিএনএ ও আমাদের শরীরে প্রবাহিত হয়, তা বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের জন্য উপযুক্ত। এই বিনিময়গুলো শুধুমাত্র আমাদের মস্তিষ্ককেই পরিবর্তিত করে না, আমাদের চেতনা এবং পৃথিবীকে দেখার প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে।
গত বছরের ৩০তম বার্ষিক ‘দ্য সায়েন্স অব কনশাসনেস’ (TSC) সম্মেলনের একটি প্লেনারী সেশনে, ডেভিড চ্যালমার্স কনশাসনেস স্টাডিজের ক্ষেত্রে একটি মূল ভূমিকা পালন করেন। সেখানে তিনি তার মায়ের চেতনার আধ্যাত্মিক পাঠ এবং তার বাবার নিউরোসায়েন্সের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। চ্যালমার্স আরও বলেন, তার মা তার ওপর শুধু মানসিক, মানসিক এবং আবেগিকভাবে প্রভাবিত করেননি, তারা একে অপরের মস্তিষ্কের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কাঠামোও প্রভাবিত করেছিলেন। তাদের প্লেসেন্টার মাধ্যমে একে অপরের কোষ এবং ডিএনএ বিনিময় করে। এই কোষগুলি মাইক্রোকাইমেরিক কোষ। চ্যালমার্স এবং তার মায়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া দ্বিমুখী কোষের স্থানান্তর, যেমনটা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে মায়ের সাথে ঘটে, সেটিকে বলা হয় ফেটো-ম্যাটার্নাল মাইক্রোচিমেরিজম (feto-maternal microchimerism)।
“কাইমেরা” শব্দটি গ্রীক পুরাণ থেকে এসেছে, যেখানে হেসিওডের থিওগনি কাব্যে একটি মাংসল দানবের বর্ণনা করা হয়েছে, যা একটি সিংহ, একটি ছাগল এবং একটি ড্রাগনের সংমিশ্রণে তৈরি। সাধারণ ভাষায় কাইমেরা শব্দটি মনের একটি বিভ্রম বা কল্পনা বোঝাতে ব্যবহার হলেও এর চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত অর্থে এটি শরীরের এমন একটি অংশকে বোঝায় যা জেনেটিকভাবে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।
মাইক্রোকাইমেরিজমের গবেষণা গত কয়েক দশকে উত্তেজনাপূর্ণ দিকে এগিয়েছে। “ম্যাটার্নাল মাইক্রোকাইমেরিজম” (Maternal microchimerism) বলতে মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে কোষ স্থানান্তরিত হওয়াকে বোঝায় এবং “ফেটাল মাইক্রোকাইমেরিজম” (Fetal microchimerism) এর মানে হচ্ছে এর বিপরীত প্রক্রিয়া, অর্থাৎ শিশুর কোষ মায়ের শরীরে প্রবাহিত হওয়া। এই বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোকাইমেরিজমের গবেষণা আমাদের দেখিয়েছে, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে কাইমেরিক (chimera) এবং আমাদের মধ্যে মায়ের কোষ রয়েছে এবং কখনও কখনও বংশ পরম্পরায় বয়ে আসা কোষও থাকে।
এমনকি কিছু গবেষণায়, মাইক্রোকাইমেরিজ্মের এই কোষ স্থানান্তরের প্রভাব কেবল আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আমাদের মন, আবেগ এবং চিন্তার প্রক্রিয়াও প্রভাবিত করতে পারে। গর্ভাবস্থায় একে অপরের সাথে কোষের বিনিময় মায়ের এবং সন্তানের মধ্যে এক ধরনের অন্তরঙ্গ সংযোগ তৈরি করে, যা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক এবং স্নায়ুবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, মা এবং সন্তান একে অপরের প্রতি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা চেতনা এবং বিশ্বের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকরা ধারণা করছেন যে, মাইক্রোকাইমেরিজমের মাধ্যমে কোষের স্থানান্তর শুধু শারীরিকভাবে নয়, চিন্তা এবং চেতনা গঠনের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি আমাদের চেতনার একটি গভীর এবং জটিল অঙ্গ, যা শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা গঠনে অবদান রাখে। আমাদের জেনেটিক কোডের মধ্যেও যে একটি নির্দিষ্ট “মাদার-চাইল্ড” সম্পর্ক বিদ্যমান, তা সম্ভবত আমাদের অস্তিত্বের অনেক গভীরে গিয়ে প্রভাবিত করে। শেষ পর্যন্ত চেতনার গভীরে এই মাইক্রোকাইমেরিজমের প্রভাব বুঝতে পারা আমাদের মানবিক প্রকৃতি, আমাদের সম্পর্ক এবং আমাদের অস্তিত্বের সারবত্তাকে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ প্রদান করতে পারে। এমনকি এটি আমাদের ভবিষ্যতের চেতনা গবেষণার জন্য নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে, যেখানে মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে অবস্থিত জেনেটিক এবং শারীরিক অভ্যন্তরীণ সংযোগকে আরও ভালোভাবে বুঝে ওঠা যাবে।
এই প্রক্রিয়া আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতাও পুনরায় মূল্যায়ন করতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যখন আমরা মা-বাবার সাথে শিশুদের স্নায়ু এবং মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্কের কথা চিন্তা করি। যত বেশি আমরা এই মাইক্রোকাইমেরিজ্মের গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যাবো, তত বেশি আমরা মানব মস্তিষ্ক এবং চেতনা সম্পর্কে নতুন নতুন সত্য জানতে পারব, যা আমাদের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে।


