মহাত্মা গান্ধী এক ক্ষীণদেহী অথচ দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মানুষ। তিনি কেবল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বই দেননি, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ নতুন দর্শন ও কার্যপ্রণালী তৈরি করে গেছেন। আইন পেশা থেকে শুরু করে “ভারতের জাতির জনক” হয়ে ওঠা পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল অবিরাম সংগ্রাম ও নতুন পদ্ধতির এক পরীক্ষা।
১৮৬৯ সালে ভারতের গুজরাটে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে বিদেশে। ১৮৯৩ সালে ২৪ বছর বয়সে নতুন অ্যাটর্নি গান্ধী আইনচর্চার জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল-এ যান। সেখানে তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হন। ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা, জনপথ ব্যবহার করায় লাঞ্ছিত হওয়া এবং ইউরোপীয় যাত্রীদের থেকে আলাদা করে রাখার মতো ঘটনা তাঁকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।
এই বর্ণবৈষম্যই তাঁকে প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৯৪ সালে যখন নাটাল সরকার ভারতীয়দের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, তখন গান্ধী ভারতীয় প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। এই প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর অনন্য প্রতিবাদী দর্শন সত্যাগ্রহ গড়ে তোলেন। সত্যাগ্রহ ছিল নৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করে অন্যায়কে প্রতিরোধ করার একটি পদ্ধতি। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, চরম নৈতিক ও আত্মিক শক্তির প্রকাশ ছিল।এখানেই ছিল তাঁর প্রথম পরিবর্তন, তিনি প্রতিবাদের জন্য হিংসার পথ পরিহার করে সত্য ও অহিংসাকে প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেন।
১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বছর কাটানোর পর গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন এবং তাঁর উদ্ভাবিত সত্যাগ্রহের দর্শনকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের নেতা নির্বাচিত হন এবং স্বাধীনতার জন্য জোরদার আন্দোলন শুরু করেন।
গান্ধী রাজনৈতিক প্রতিবাদকে জনসম্পৃক্ততার এক নতুন স্তরে নিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলো কেবল অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজের সাধারণ মানুষকেও এর সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে বিনা বিচারে সন্দেহভাজন বিপ্লবীদের কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া রাউলাট অ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে গান্ধীজির নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার এই অহিংস প্রতিরোধের জবাবে চরম নৃশংসতা প্রদর্শন করে। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ৪০০-এরও বেশি নিরস্ত্র, অহিংস বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বর্বরতা গান্ধীর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, অহিংসা ও নৈতিক শক্তি দিয়ে ব্রিটিশদের সামরিক শক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব। এই হত্যাকাণ্ড ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং গান্ধীজিকে আরও কঠোরভাবে হোম রুলের জন্য চাপ দিতে উৎসাহিত করে।
গান্ধীর রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো Salt March। ১৮৮২ সালের একটি ব্রিটিশ আইন ভারতীয়দের স্থানীয়ভাবে লবণ উৎপাদন না করে ব্রিটিশ লবণ কিনতে বাধ্য করত। এই অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজি এক বিশাল সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ২৪১ মাইল দীর্ঘ পদযাত্রা করে গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছান এবং আরবসাগরের তীর থেকে লবণ সংগ্রহ করে আইন অমান্য করেন। এই প্রতীকী প্রতিবাদ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই ঘটনায় ব্রিটিশ সরকার ৬০,০০০-এরও বেশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীকে কারারুদ্ধ করে, কিন্তু এর ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। গান্ধী প্রমাণ করেন সাধারণ ও প্রতীকী প্রতিবাদও কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই সময়ের মধ্যেই গান্ধী জাতীয় আইকনে পরিণত হন এবং তিনি “মহাত্মা” উপাধিতে ভূষিত হন। সংস্কৃত ভাষায় যার অর্থ মহান আত্মা বা সাধু ।কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি “অস্পৃশ্যদের” প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেন, প্রশ্ন তোলেন ভারতের জাতিভেদ প্রথার মূল নিয়ে। তাঁর “ভারত ছাড়ো আন্দোলন”-এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের ভারত থেকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন, যা স্বাধীনতার পক্ষে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়।
১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি একজন হিন্দু চরমপন্থীর হাতে গান্ধীজি নিহত হন।
গান্ধীর উত্তরাধিকার ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি নাগরিক অসহযোগের মুখ বদলে দিয়েছিলেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় তাঁর কৌশল গ্রহণ করেন। দালাই লামা এবং বিশ্বজুড়ে যারা সহিংসতা ছাড়াই পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন, তারা গান্ধীজির শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
গান্ধী প্রমাণ করেন শারীরিক শক্তি বা হিংসা ছাড়াই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আত্মিক দৃঢ়তার মাধ্যমে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। তাঁর পদ্ধতি রাজনৈতিক প্রতিবাদকে ধ্বংসাত্মক পথ থেকে একটি গঠনমূলক, নৈতিক আন্দোলনের দিকে চালিত করেছিল।
তবে তাঁর জীবন এবং কর্মপদ্ধতি বেশ জটিল ছিল। দলিতদের অধিকার নিয়ে তাঁর সংগ্রাম এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি তাঁর অবিচল সমর্থন একদিকে যেমন তাঁকে পূজনীয় করেছে, তেমনি অন্যদিকে তিনি কিছু কঠোর সমালোচনাও পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তাঁর কিছু মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর “ব্রহ্মচর্য পরীক্ষা” নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তা সত্ত্বেও,মহাত্মা গান্ধী নামক এই জন-ব্যক্তিত্ব ভারতের ইতিহাস এবং বিশ্বজুড়ে নাগরিক প্রতিবাদের অনুশীলনে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর অহিংসার দর্শন আজও বিশ্বজুড়ে সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষীদের জন্য একটি কার্যকরী নীলনকশা হিসেবে বিবেচিত। রাজনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাসে গান্ধী এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন, যেখানে অহিংসাই হলো চূড়ান্ত বিজয়ী শক্তি।”


