মহাকাশে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খোঁজ

মহাবিশ্ব একটি বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের সূচনা হয়েছিল প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এক মহা-বিস্ফোরণে, যাকে আমরা ‘বিগ ব্যাং’ নামে জানি। সেই মুহূর্ত থেকেই মহাকাশে শুরু হয়েছে শূন্যতা, শক্তি, পদার্থ ও সময়ের অপূর্ব খেলা। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক বিস্ফোরণের সন্ধান পেয়েছেন, যা বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ সুপারনোভা নয়, বরং এক নতুন ধরনের বিস্ফোরণ, যাকে বলা হচ্ছে Extreme Nuclear Transient (ENT) বা চরম পারমাণবিক ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত।

এই বিস্ফোরণের খোঁজ পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষণায়। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণ সাধারণ সুপারনোভার চেয়েও বহু গুণ শক্তিশালী। ENT বিস্ফোরণের সময় এক বছরে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা প্রায় ১০০টি সূর্যের সমগ্র জীবদ্দশায় উৎপাদিত শক্তির সমতুল্য।

কিভাবে আবিষ্কৃত হলো এই ENT?

জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিংকল এই বিস্ফোরণের প্রথম আলামত খুঁজে পান যখন তিনি দূরবর্তী এক ছায়াপথের কেন্দ্রে দীর্ঘস্থায়ী আলোচঞ্চলা বা অগ্নিতরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আগে থেকে জানা ছিল, সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বা ‘সুপারভারসীম কৃষ্ণগহ্বর’ কোনো বিশাল নক্ষত্রকে টেনে নিয়ে গেলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু এবার দেখা গেল ENT টাইপের বিস্ফোরণ এতোটা শক্তিশালী যে একে সাধারণ নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না।

হিংকল বলেন, “আমরা এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সুপারনোভা বা নক্ষত্র ধ্বংসের দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু ENT যেন অন্য কিছু, এটা ছিল ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল এবং বছরের পর বছর ধরে এর আলোকিত প্রভাব টিকে থাকে।”

এই ENT বিস্ফোরণের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে যার নাম Gaia18cdj। এটি একটি বিশেষ নক্ষত্রীয় বিস্ফোরণ যা আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করেছে। Gaia স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই বিস্ফোরণের আলোর উপস্থিতি ধরা পড়ে। বিস্ফোরণটি এতই শক্তিশালী ছিল যে গবেষকেরা বলছেন, এটি পরিচিত সবচেয়ে উজ্জ্বল সুপারনোভার থেকেও ২৫ গুণ বেশি শক্তি ছড়িয়েছে।

সাধারণত একটি সুপারনোভা এক বছরে সূর্যের ১০ বিলিয়ন বছরের সমান শক্তি নিঃসরণ করে। কিন্তু Gaia18cdj সেই সময়েই ১০০টি সূর্যের সমান শক্তি মুক্ত করেছে।

কেন এত শক্তিশালী?

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে একটি অতি-দৈত্যাকৃতি কৃষ্ণগহ্বর। কোনো একটি নক্ষত্র যখন এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছে চলে আসে, তখন তার উপর ভয়াবহ আকর্ষণ বল প্রয়োগ হয়। একে বলে tidal disruption event (TDE)—নক্ষত্রকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার প্রক্রিয়া। এই ENT হলো TDE-এরই একটি চরম রূপ, যেখানে আকর্ষণ বল এত বেশি হয় যে নক্ষত্র একেবারে পারমাণবিক স্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেই সঙ্গে সৃষ্ট হয় ভয়াবহ তাপ, চাপ ও বিকিরণ।

এই বিকিরণের ফলে গামা রশ্মি, এক্স-রে ও দৃশ্যমান আলোর তীব্র তরঙ্গমালা সৃষ্টি হয়, যা আমাদের দূরবর্তী টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। এই ENT বিস্ফোরণকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া শক্তি এবং আলো মহাবিশ্বের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেও ধরা যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন ENT আমাদের নক্ষত্রের জীবনচক্র এবং কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। এমনকি এটা মহাবিশ্বে পদার্থ ও শক্তির চূড়ান্ত সীমা কোথায়, সে প্রশ্নও তুলছে। হিংকল ও তাঁর দল এখন পৃথিবীর বৃহত্তম টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আরও এমন বিস্ফোরণের অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। প্রতিটি নতুন ENT আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মহাবিশ্বের গভীর, গোপন গঠন এবং শক্তির রহস্য উদ্ঘাটনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন