মধুবনী চিত্রকলা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন, তার ইতিহাসে লুকিয়ে রয়েছে অদ্ভুত রহস্য। এই চিত্রকলার উৎপত্তি বিহারের মধুবনী জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে। ভারতের ‘মিথিলা’ অর্থাৎ বিহার এবং নেপালে উৎসব বা পালা-পার্বনে গৃহ সজ্জার জন্য লোক চিত্রকলা বহুকাল ধরে প্রচলিত আছে। মিথিলার অন্য নাম মধুবন, তাই একে মধুবনী চিত্র বা মিথিলা চিত্র বলা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই, মধুবনী চিত্রকলা গ্রাম্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। এটি মূলত মেয়েরা তাদের ঘরের দেয়ালে আঁকত। চিত্রকলার বিষয়বস্তু ছিল দেবদেবী, প্রাকৃতিক দৃশ্য, পশু-পাখি এবং দৈনন্দিন জীবন। তবে এই সাদামাটা চিত্রকলার পেছনে মজার ইতিহাস রয়েছে, যা সাধারণত অজানা।
প্রথমদিকে মধুবনী ছবি শুধু হিন্দু দেব-দেবীদের উপাখ্যানের উপর রচনা করা হতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী যারা উপস্থিত থাকতেন, তারা হলেন রাম-সীতা, কৃষ্ণ, লক্ষী, শিব, দূর্গা, সরস্বতি। এ ছাড়াও রামায়ন কাহিনী থেকে বেছে নেয়া হতো নানা পার্শ্ব চরিত্রও, যেমন দেব-দেবীর সঙ্গী-সাথীরা বা চন্দ্র-সূর্য, ময়ূর। ছবির প্রকাশভঙ্গী ছিলো যথেষ্ট সহজ সরল।
পরে বিহারে মধুবনী অঞ্চলের শাসক রাজাদের সঙ্গে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে উঠে এই চিত্রকলার সাথে। জনমুখে কথিত আছে, একসময় মধুবনীতে এক রাজা শাসন করতেন, তিনি তার রাজ্যে এক বিশেষ ধনের চিত্রকলা প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। তার এক বিশেষ সিদ্ধান্ত মধুবনী চিত্রকলার ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন এনে দেয়। রাজা চেয়েছিলেন এই চিত্রকলার মাধ্যমে তার রাজ্যের অদ্ভুত ঘটনা ও লুকানো প্রতীক তুলে ধরতে। তিনি এক চিত্রকরকে নিযুক্ত করেছিলেন, যার কাজ ছিল শুধুমাত্র রাজ্যের গভীরতা এবং তার রাজ্যের গোপন ইতিহাসকে চিত্রিত করা। সেসময় থেকে এই চিত্রকলায় যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, রাজনীতি, ক্ষোভ এবং রাজাদের ক্ষমতার লুকানো দিকগুলি চিত্রিত হতে শুরু হয়।
এই পরিণতির ফলস্বরূপ, মধুবনী চিত্রকলা কেবলমাত্র একটি সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং তা এক গভীর রাজনৈতিক প্রতীকও হয়ে ওঠে মানুষের কাছে। বলা হয়, মধুবনী চিত্রকলা এমন এক রূপে গড়ে ওঠে যেখানে প্রতিটি আঁকা রেখার মধ্যে যেন লুকিয়ে থাকতো এক ধরনের গল্প, যা কেবলমাত্র বিশেষ মানুষটিই বুঝতে পারতো। এছাড়া মধুবনী চিত্রকলায় ব্যবহৃত উপকরণ এবং শৈলীও ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত। প্রাচীনকাল থেকে এই চিত্রকলা শুধুমাত্র সাদা, কালো, নীল এবং হলুদ রঙের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল। রঙের উপাদান ছিলো চালের গুড়া, তেতুল এবং আরও নানা রকম ফল ও ফলের বিচী, ফুলের রেনু, প্রাকৃতিক নীল, চন্দন কাঠ, বিভিন্ন ফুল ও গাছের পাতা, গাছের ছাল-বাকল, কচি ডাল ও লতা। রং তৈরীর জন্য ফুলও ছেঁড়া হতো না, ঝরে পড়া ফুল ব্যবহার করা হতো। শিল্পীরা নিজ হাতে পরম যত্নে রং তৈরী করতেন।
চিত্রকর্মের প্রতিটি রেখার মধ্য দিয়ে সেই সময়কার সমাজের বিভাজন, কাহিনী এবং জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প প্রকাশিত হতো। কিছু কিছু চিত্রে এমনভাবে শক্তি দয়া, ক্ষমতা এবং রাজনীতির লুকানো বার্তা ফুটে ওঠে যে, তা এক সময়কার ‘বিষাদ ইতিহাস’কেও স্মরণ করিয়ে দেয়। মধুবনী চিত্র শুধুমাত্র একটি প্রাচীন শিল্প নয়, বরং এমন এক শৈলী, যা সময়ের সাথে সাথে মানব ইতিহাসের শক্তিশালী প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে। এ চিত্রকলায় যেমন সংস্কৃতির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তেমনি এর মধ্যে ঐতিহাসিক মিথ, রাজনৈতিক খেলা এবং ব্যক্তিগত প্রতীক মিলে গোপন কিছু রহস্য রয়েছে যা কিনা আজও এক ধরনের ঐতিহাসিক সংকেত হিসেবেই আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।


